সোমবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৭

ads

ইসরায়েল প্রতিষ্ঠা; পরিকল্পিত এক ষড়যন্ত্রের লোমহর্ষক ইতিহাস

OURISLAM24.COM
ডিসেম্বর ৬, ২০১৭
news-image

সাবের চৌধুরী

বর্তমানে ইহুদিবাদ ও ইসরায়েল একটি আরেকটির সমার্থকে পরিণত হয়েছে। এই ইহুদিরা কিছুদিন আগ পর্যন্তও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে উদ্বাস্তুর মত ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও বর্তমানে ইজরায়েল এদের মূল আবাসভূমি। এ রাষ্ট্রটি গঠনের পেছনে রয়েছে জায়নবাদি আন্দোলন নামে পরিকল্পিত এক ষড়যন্ত্রের লোমহর্ষক ইতিহাস।

জায়নবাদ। ইংরেজিতে একে বলা হয় Zionism. আরবিতে বলা হয় সুহয়ূনিয়্যাহ (الصهيونية)। হিব্রু Zion শব্দ থেকে এর উৎপত্তি। জয়ন বা সাহয়ূন (صهيون) হচ্ছে জেরুজালেমের একটি পাহাড়ের নাম এবং এর অর্থ হচ্ছে দাগ কাটার মতো ঘটনা বা স্মৃতি উৎসব।

এখানে বলে রাখা ভালো যে জায়নবাদ মানেই ইহুদি নয়। সত্যিকার অর্থে জায়নবাদ ইহুদিদের থেকেই জন্ম নেওয়া একটি বিশেষ আন্দোলন। এ আন্দোলনের লক্ষ্য হলো ইসা মসিহের জন্য অপেক্ষা না করে নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে হাইকেলে সুলেমানিকে পুনঃনির্মাণ করা, জেরুজালেমকে কেন্দ্র করে ফিলিস্তিনে একটি ইহুদি রাষ্ট্র কায়েম করা এবং এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়ে পুরো পৃথিবীকে ইহুদি কর্তৃক নিয়ন্ত্রণ করা।

উল্লেখ্য, হাইকেলে সুলাইমান হলো, ইহুদিদের ধারণা মতে মসজিদে আকসার সন্নিকটে হজরত দাউদ ও সুলায়মান আ. কর্তৃক নির্মিত একটি উপাসনালয়।

ইসরায়েলে সংগঠিত হওয়ার আগে পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও এ মিশন বাস্তবায়নের জন্য তারা প্রত্যেকে আপন অবস্থান থেকে কাজ করে গেছে। এ হিসেবে জায়নবাদের ইতিহাস বহু প্রাচীন। ইউরোপে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থানে নিজেদের মূল লক্ষ্য ঠিক রেখে সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, সংস্কৃতি ও বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের রূপ ধরে এটি বিকশিত হয়েছে এবং এভাবে নিজেদের গোপন অভিপ্রায় ও স্বকীয়তা টিক রেখে সমাজের সাথে মিশে গেছে এবং যে যেখানে থেকেছে যেভাবে পেরেছে সুযোগ কাজে লাগিয়েছে।

গোপন নীল নক্সা প্রয়োগ করে খৃস্টান জগতকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে, ইউরোপকে ক্রুসেড যুদ্ধসহ বিভিন্ন যুদ্ধে নিপতিত করে সংকটে ফেলে নিজেকে ঋণে আবদ্ধ করে ইউরোপকে নিজেদের অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়।

বিভিন্ন দেশে নারী, অর্থ ও নানান কৌশলে বড় বড় রাজনৈতিক নেতা, বুদ্ধিজীবী, সংগঠক, সাহিত্যিকদের বিপুলভাবে আকৃষ্ট করে। এমনকি খৃস্টানদের মধ্যে একসময় চারটি শ্রেণি দাঁড়িয়ে যায়- আসল খৃস্টান, ইহুদি খৃস্টান, খৃস্টান ইহুদি ও ইহুদিজাত খৃস্টান।

তাদের পক্ষে খৃস্টান কর্তৃক অনেক সংগঠন দাঁড়িয়ে যায়। উনবিংশ শতাব্দিতে J.N Darloy প্রতিষ্ঠিত Plymouth Brethren এমনি একটি সংগঠন। তাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ১৮৪০ এর দশকে লর্ড সভার দু’জন সদস্য সাফটেসবারি এবং পালামারস্টন ইহুদি সমস্যার সমাধানের জন্য ফিলিস্তিনে একটি ইহুদি কলোনি প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেন। তৎকালীন কবি সাহিত্যিকরা এ প্রস্তাবকে এগিয়ে নেন।

তবে আধুনিক জায়নবাদের উত্থান উনবিংশ শতাব্দির শেষদিকে অস্ট্রিয়ায়। ১৮৮০ সালে নাকান বেরেনবুয়ান নামে এক অস্ট্রিয়ান ইহুদিদের জেরুজালেমে ফিরে যাওয়ার জন্য একটি আন্দোলনের প্রস্তাব করেন। ১৮৯৬ সালে অস্ট্রিয়ান এক দুর্ধর্ষ ইহুদি সাংবাদিক ড. থিওডর হার্জেল (Theodor Herzl -১৮৬০-১৯০৪) তার রচিত ’ডের জুডেন্সটাট’ বা The Jewish State গ্রন্থটির মাধ্যমে জায়োনিস্ট আন্দোলনের রূপরেখা প্রণয়ন করেন এবং International Zionist Organization নামে একটি রাজনৈতিক দল গড়ে তোলেন।

প্রথমে ইউরোপজুড়ে তার এ আন্দোলন বিপুলভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরবর্তীতে আমেরিকা ও রাশিয়ায়ও এর উত্থান ঘটে।

আদর্শিক, রাজনৈতি, প্রশাসনিক, সামাজিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, বৈজ্ঞানিক, সাংস্কৃতিকসহ বিভিন্ন কাঠামোতে তারা বিশ্বব্যাপী অসংখ্য সংগঠন তৈরি করে। এরা প্রতিনিয়ত ইহুদি স্বার্থের জন্য পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে কাজ করে যায়।

প্রত্যক্ষভাবে কাজ করা সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক ইহুদী কংগ্রেস, আন্তর্জাতিক জায়নিস্ট লীগ, বেরিহাহ মুভমেন্ট, হাগানাহ ইত্যাদি।  পরোক্ষভাবে কাজ করছে যেমন : International Monetary Fund. World Bank. International Red Cross. UNDP. UNICEF. UNESCO ইত্যাদি।

এই ইহুদি সাংবাদিকের নেতৃত্বেই ১৮৯৭ সালের ২৯ ও ৩০ আগস্টে অনুষ্ঠিত সম্মেলন হয় সুইজারল্যান্ডের বাজিল (BAZIL) নগরীতে। অতঃপর বিশ্বের ৩০টি ইহুদি সংগঠনের প্রায় ৩০০ জন ইহুদি নেতা ইহুদিবাদকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয় এবং সারা বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করার সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পিত নীল-নকশা প্রণয়ন করেন। পরবর্তীতে যে পরিকল্পনাটি ২৪ প্রটোকল আকারে প্রণীত হয়।

গড়ে তোলা হয় বহিরাগত ইহুদিদের জন্য ফিলিস্তিনিদের থেকে জমি কেনা বা লিজ গ্রহণে অর্থায়নের জন্য উদ্দেশ্যে জুয়িশ ন্যাশনাল ফান্ড (Jewish National Fund). পূর্ব থেকে বিচ্ছিন্নভাবে ইহুদিরা ফিলিস্তিনে আসতে শুরু করলেও উল্লেখযোগ্য হারে আসতে শুরু করে ১৮৮০ থেকে ।

১৯০৫-১৯০৭ সালে বৃটেনে সংঘটিত হয় ২ বছরব্যাপী এক কনফারেন্স। সেখানে ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। এই কনফারেন্সের সুপারিশক্রমে বৃটিশ পররাষ্ট্র সচিব আর্থার বেলফোর জায়ানিস্ট নেতা ব্যারন রসথচাইল্ডকে একটি চিঠির মাধ্যমে ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র কায়েমের অনেকটা আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন।

১৯৪৮ সনে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েল ঘোষণার মাধ্যমে জায়নবাদের নেতৃত্ব ইউরোপ থেকে ইসরায়েলে স্থানান্তরিত হয় এবং এ আন্দোলন তার অন্যতম একটি লক্ষ পূরণে সমর্থ হয়। তবে শুধু একটি রাষ্ট্র গঠন করা তাদের লক্ষ্য নয়; তাদের উদ্দেশ্য হল একে উপলক্ষ্য করে পুরো পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করা। বর্তমানে এ জিয়নিস্টরা ইসরায়েলের বাইরেও বিশ্বজুড়েই সত্যিকার অর্থে তারা আজ একটি গোপন অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

সূত্র : আল মাউসুআতুল মুয়াস্সরাহ ফিল আ্দইয়ান ওয়াল মাজাহিবি ওয়াল আহযাবিল মুআসিরাহ।
তারীখু ফিলিস্তিন আলমুছাওয়ার। আরবি উইকিপিডিয়াসহ গ্রহণযোগ্য বিভিন্ন এরাবিক সাইট।

আরআর