বৃহস্পতিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০১৮

ads

নিষিদ্ধ সম্পর্ক; বাড়ছে কেন? করণীয় কী?

OURISLAM24.COM
ডিসেম্বর ৫, ২০১৭
news-image

শাহনূর শাহীন
সাব এডিটর

মাহমুদুল তালুকদার। বয়স ২৫। বাড়ি সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায়। উপজেলার বড়হর ইউনিয়নের খাসচর জামালপুর গ্রামের বাসিন্দা শহিদুল তালুকদার (৫০) এর ছেলে।

গত ২৪ সেপ্টেম্বর মাহমুদুল তার আপন ফুফু রওশনারাকে নিয়ে এলাকা থেকে উধাও হয়ে যায়। এরপর আর ফেরেনি। তারা প্রায় সমবয়সী ছিল। তাদের অতীত আচরণ ও চলাফেরায় মানুষের বুঝতে বাকি নেই তাদের মাঝে অবৈধ সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল এবং আছে।

মাহমুদুল-রওশনারা বর্তমানে একসঙ্গে বসবাস করছে। দুজনে বিয়ে করে ফেলেছে এটাও প্রায় নিশ্চিত। গণমাধ্যম বরাতে জানা যায় ছেলের ঘরের নাতির সঙ্গে নিজের মেয়ে পালিয়ে যাওয়ায় লজ্জা ও ক্ষোভে মেয়ের মা মেয়েকে ত্যাজ্য ঘোষণা করেছে।

গণমাধ্যমকে মেয়ের মা বলেন, আমার স্বামী মারা যাওয়ার পর অনেক কষ্টে ছেলে মেয়ে লালন-পালন করেছি। আমার কন্যা রওশনারা আমার আদেশ অমান্য করে অসামাজিক কাজে লিপ্ত থাকত। তাকে ভালো হতে বললেও শুনত না বরং উল্টা আমাকে মারপিট করত। এমনকি আমাকে হত্যা করার হুমকিও দিয়েছিল।

মেয়ের নানান কুকর্মের জন্য আমাকে বারবার সমাজে অপমানিত হতে হয়েছে। সে যেই কাজ করেছে সেটা কোনোদিন মেনে নেয়া সম্ভব না। তাই আমার অন্যান্য সন্তানদের ভালোর জন্য মেয়ে রওশনারাকে কোর্টের মাধ্যমে এফিডেফিট করে ত্যাজ্য করেছি।

ঘটনা স্বীকার করে মাহমুদুলের মা বলেন, তাদের মধ্যে দীর্ঘদিন প্রেমের সম্পর্ক ছিল। এ ব্যাপারটি মীমাংসার জন্য দুই পরিবারের মধ্যে একাধিকবার বৈঠকও হয়েছিল।পারিবারিকভাবে বিয়ের জন্য প্রস্তাব দেয়া হলেও মেয়ের পরিবার তা মেনে নেয়নি। তারা দুজন নিজের ইচ্ছে মতো বিয়ে করে থাকতে পারে। কিন্তু কোথায় আছে এ ব্যাপারে আমরা কিছু জানি না।

দুই.

পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ির পানছড়ির আইয়ুব নগর গ্রামের বাসিন্দা শাহাদাত হোসাইন। বিয়ে করেছেন প্রায় ১৪ বছর। ৩৩ বছর বয়সী স্ত্রী আমেনা বেগমের ঘরে রয়েছে তার দুই সন্তান। শাহাদাত হোসেন চাকরি করেন  চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি কোম্পানিতে প্রায় এক যুগ ধরে।

এই সুযোগে তার আপন বড় ভাই দেলোয়ার হোসেনের ছেলে টমটম চালক ২২ বছর বয়সী ইলিয়াছের সঙ্গে আমেনা বেগমের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে।

বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে গত বুধবার (২৯ নভেম্বর) আমেনা-ইলিয়াছ এলাকা থেকে উধাও হলে। বুধবার রাতে খাগড়াছড়িতে ইলিয়াছের চালিত টমটমটি পাওয়া গেলেও চাচি-ভাতিজা জুটি এখনো ফেরেনি। আপন ছোট ভাইয়ের স্ত্রীকে নিয়ে ছেলের পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় বিমর্ষ হয়ে পড়েছেন ইলিয়াছের বয়স্ক বাবা দেলোয়ার।

তিন.

অপরাধ প্রবণতা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। অধিকাংশ সামাজিক অপরাধ সংঘঠিত হয় পুরুষের দ্বারা। আর অপরাধ সংঘঠিত হওয়ার পেছনে নারীর থাকে প্রভাবক ভূমিকা। এমন কিছু অপরাধ আছে যা স্বাভাবিকভাবে পুরুষসুলভ। এরকম অপরাধ কর্ম করে ‍কেউ কেউ শাস্তি পেলেও লজ্জিত হয় না।

যেমন দাঙ্গা-হাঙ্গামা, মারপিট করা। এক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই পক্ষ-বিপক্ষ থাকে। ক্ষেত্র বিশেষে তৃতীয় পক্ষের লোকের মধ্য থেকেও অহরহ সময় অপরাধীর পক্ষ নিতে দেখা যায়। কিন্তু এমন কিছু অপরাধ আছে যা ধরা পড়লে আপন স্বজনারা পর্যন্ত লজ্জায় ঘৃণায় অপরাধীর পক্ষে কথা বলার সাহস পায় না।

নারী কেলেঙ্কারি, নারী ও পুরুষের মাঝে বিবাহ বহির্ভূত অবৈধ সম্পর্ক, বিবাহ পরবর্তী  জীবনে পরকীয়ার মতো ঘটায় কখনোই কোনো সভ্য মানুষ অপরাধীর পক্ষে থাকে না। সবাই তাকে নিন্দা করে, ঘৃণা করে।

সামাজিক মূল্যবোধ এবং নৈতিক শিক্ষা উভয়ে সঙ্গত কারণেই পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত। নৈতিক শিক্ষা না থাকলে বা উপযুক্ত না হলে মূল্যবোধ কখনো কখনো হোচট খেতে পারে। কিন্তু সামাজিক মূল্যবোধে যদি খানিকটা ঘাটতিও থাকে পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষা থাকলে কিছুতেই এমন হীন কাজ কারো দ্বারা সম্ভব নয়।

আলোচিত নিন্দিত এমন সব ঘটনায়ও অধিকাংশ সময় কোনো না কোনোভাবে এসব ঘটনা মেনে নিতে হয়। সামাজিক একটা ফয়সালার মাধ্যমে সমাজে বসবাস করার সুযোগ দেয়া হয়। কেউ কেউ অনিচ্ছাকৃত অনুসমর্থনও দিয়ে থাকে। ঘটনা যেহেতেু ঘটেই গেছে ফেরানো যেহেতু যায়নি মেনে নেয়াটা সামাজিক প্রেক্ষাপটে খুব বেশি অস্বাভাবিকও না।

কেউ কেউ ঠাট্রার ছলে হলেও এমন বলে থাকে, যুবক বা যুবতী তরুণ বয়সে এরকম করতেই পারে! কিন্তু বিস্ময়ের ব্যপার হলেও সত্যি, ইসলাম ঘোষিত বৈবাহিক সম্পর্ক নিষিদ্ধ পরস্পর সম্পর্কীয় এমন নর-নারী এমন নিন্দিত কাজে লিপ্ত হলে পৃথিবীর কোনো সভ্য সমাজই সেটা মেনে নেয় না, মেনে নিতে পারে না।

অপরিচিত কিংবা বিবাহ করা যায় এমন নারীর সাথে কোনো পুরুষের বিবাহ পূর্ব সময়ে দৈহিক সম্পর্ক ধর্মীয়ভাবেও নিষিদ্ধ সামাজিকভাবেও তাই। কিন্তু বিবাহ পরবর্তী সময়ে সেটা নিষিদ্ধ নয় বরং সম্পূর্ণ বৈধ।

অপরদিকে মা, খালা, ফুফু, বোনসহ বিবাহ নিষিদ্ধ নারী এমনকি চাচা মামার সাথে সম্পর্ক  থাকা অবস্থায় চাচি-মামিকে নিয়ে এমটা কল্পনা করাও অবৈধ এবং জঘন্যতম নোংরামি। এটা কোনো পর্যায়ে গিয়েই বৈধ হওয়ার সুযোগ রাখে না। এটা সর্বাবস্থায় নিষিদ্ধ এবং নিন্দনীয়। এজন্যই আলোচ্য শিরোনামে বিষয়টিকে নিষিদ্ধ সম্পর্ক বলা হয়েছে।

এতা কিছুর পরেও কেন ঘটছে এমন নিন্দনীয় ও অপরিণামদর্শী  ঘটনা? এর কারণ কী? এর থেকে উত্তরণেরই বা উপায় কী?

আমরা যদি একটু পেছন ফিরে তাকাই, সামান্য পর্যালোচনা করি তাহলে মোটাদাগে এর দুইটি প্রধান কারণ খুঁজে পাব। প্রথমটি সামাজিক মূল্যবোধ, দ্বিতীয়টি হচ্ছে নৈতিক শিক্ষা।

সামাজিক মূল্যবোধ: সামাজিক মূল্যবোধ হচ্ছে সমাজের সকল মানুষের সাথে ব্যক্তির আচার-আচরণ, দায়িত্ব ও কর্তব্য এবং সমাজিক সম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ বা তার মূলনীতি। সামাজিক মূল্যবোধের প্রাথমিক শিক্ষা একটা মানুষ পরিবার থেকেই পেয়ে থাকে।

পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে উঠা একটা শিশু আপনা আপনিই এটা শিখে নেয়, পরিবারের কার সাথে তার কীরুপ সম্পর্ক হবে। কার সাথে কেমন আচরণ করতে হবে এবং এই সম্পর্কের ভিত্তি কী।

এই ছোট্র শিশু আস্তে আস্তে যখন বড় হয়ে উঠে তখন তাকে অবস্থাভেদে সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তি ও তার মূলনীতি, সামাজিক দায়-দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করা পরিবারের গুরু দায়িত্ব।

সামাজিক মূল্যবোধের উপর বেড়ে উঠা একজন অশিক্ষিত মানুষের পক্ষেও এমন নিষিদ্ধ সম্পর্কে জড়ানো কিংবা এমন জঘন্যতম হীন কাজ করা সহজেই সম্ভব নয়। মূল্যবোধের পাশাপাশি যদি উপযুক্ত নৈতিক শিক্ষা থাকে তাহলে তা কিছুতেই সম্ভব নয়।

মূল্যবোধের শিক্ষা লালনকারী একটি মানুষ এহেন কর্ম করার আগে অন্তত একবার হলেও এটা ভাববে যে, আমার সমাজ আমার পরিবার বিষয়টা কীভাবে মূল্যায়ন করবে। তারা এটাকে সমর্থন করবে, নাকি নিন্দা করবে। সমাজ আমাকে আশ্রয় দিবে, নাকি তাড়িয়ে দিবে।

নৈতিক শিক্ষা: নৈতিক শিক্ষা হলো মূলত ধর্মীয় নীতি জ্ঞানের শিক্ষা। অনেকে সাধারণ নীতি জ্ঞানের কথা বললেও নৈতিক শিক্ষায় ধর্মের উপস্থিতি না থাকলে সেটা টেকসই হয় না। পৃথিবীর প্রত্যেক ধর্মেই নৈতিক শিক্ষার উপর যথেষ্ঠ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

ইসলামে রয়েছে নৈতিক শিক্ষার পূর্ণাঙ্গ এবং সর্বাধিক যথোপযুক্ত বিবরণ। ইসলামে নৈতিক শিক্ষার সাথে পরকালে আল্লাহর শাস্তির ভয়ের একটা নিবিড় সম্পর্ক থাকে। যার কারণে ইসলামের উপযুক্ত নৈতিক শিক্ষা পেলে একটা মানুষ সহজেই অপরাধ কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয় না, হতে পারে না।

কেননা এক্ষেত্রে ইসলামের নৈতিক শিক্ষা এতোটাই পূর্ণাঙ্গ এবং প্রবল শক্তিশালী যে, যেই সমস্ত নারীদের বিবাহ করা নিষিদ্ধ তেমন নারীর সাথেও পুরুষের একান্তে দেখা সাক্ষাত, সময় কাটানো কিংবা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ প্রতঙ্গ উন্মুক্ত করাটাও নির্দিষ্ট সীমারেখায় চিহ্নিত।

নিষিদ্ধ যত কদাচার আছে মুক্ত হয়ে পবিত্র হয়ে উঠুক আমাদের সমাজ। আলোকিত হোক আমাদের পরিবার। ছড়িয়ে পড়ুক নৈতিক ও মূল্যবোধের শিক্ষা।

আলোচ্য ঘটনার প্রথমটিতে গণমাধ্যম সুত্রমতে ভাতিজা এবং ফুফু ছোট বেলা থেকেই এক সঙ্গে চলাফেরা থাকা-খাওয়া এবং গভীরভাবে মেলামেশা করত। অথচ ইসলামী নৈতিকতা এখানেও একটা সীমারেখা টেনে দেয়।

ইসলাম বলে ভাতিজা-ফুফু কিংবা চাচা-ভাতিজি হলেও কখনোই একান্তে মেলামেশা বা এক সঙ্গে থাকার কোনো সুযোগ নেই। এমনকি মায়ের শরীরের পেছনের অংশ অর্থাত পিঠ সন্তানের জন্য দেখার অনুমতি থাকলেও সন্তান প্রাপ্ত বয়স্ক হলে সচরাচর দেখা বা দেখানোর ব্যপারে ধমকের সহিত কঠোর সতর্কতার অবলম্বনের কথা বলা হয়েছে ইসলামি নৈতিকতায়।

সামাজিক মূল্যবোধ এবং নৈতিক শিক্ষা উভয়ে সঙ্গত কারণেই পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত। নৈতিক শিক্ষা না থাকলে বা উপযুক্ত না হলে মূল্যবোধ কখনো কখনো হোচট খেতে পারে। কিন্তু সামাজিক মূল্যবোধে যদি খানিকটা ঘাটতিও থাকে পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষা থাকলে কিছুতেই এমন হীন কাজ কারো দ্বারা সম্ভব নয়।

সুতরাং এরকম জঘন্যতম, ঘৃণিত, নিন্দিত, কদর্যপূর্ণ, নোংরা, নিষিদ্ধ সম্পর্কের অপ-প্রণয় থেকে পরিবার ও সমাজকে পবিত্র রাখতে হলে সামাজিক মূল্যবোধ ও যথোপযুক্ত নৈতিক শিক্ষা দেয়া সচেতন পরিবারের আবশ্যকীয় কর্তব্য।

আমরা এবং আমাদের পরিবার যেন সেই দায়িত্ব যথাযথ পালন করতে পারে। নিষিদ্ধ যত কদাচার আছে মুক্ত হয়ে পবিত্র হয়ে উঠুক আমাদের সমাজ। আলোকিত হোক আমাদের পরিবার। ছড়িয়ে পড়ুক নৈতিক ও মূল্যবোধের শিক্ষা।

আরআর