বৃহস্পতিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৭

ads

প্রিয় দারুল উলুম দেওবন্দ ও তার উদারতা

OURISLAM24.COM
নভেম্বর ২১, ২০১৭
news-image

যুবাইর হানিফ
শিক্ষার্থী: দারুল উলুম  দেওবন্দ, ভরত৷

ইসলামে দ্বীনি মাদারিসের সূচনা হয়েছিলো সেই মাসজিদে নববীর আসহাবে সুফফা-সাহাবাদের দিয়ে। আর এই ধারায় ৪০০ হিজরী পর্যন্ত তা’লিম তাদরিসের কাজ মাসজিদেই সম্পাদিত হতো। অর্থাৎ মাসজদের কোন একপাশ তা’লিম, তাদরিসের জন্যে বিশেষভাবে নিার্ধারণ করা থাকতো। তখন মাদারসা মকতবের প্রচলিত  পদ্ধতি ছিলো না।

বর্তমানের নিয়মতান্ত্রিক মাদরাসার সূচনা হয় পঞ্চম শতাব্দি থেকে৷সাধারণত বলা হয় এই ধারার সর্বপ্রথম মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন বাগদাদে মাদরাসায়ে নিযাামিয়া নামে বাদশাহ নিযামুল মুলক তুসি রহ. (মৃত্য: ৪৮৫হি.)

কিন্তু ‘তারিখে দারুল উলুমে’ বলা হয় এই ধারণাটি সঠিক নয়৷বরং আল্লাহ তা’য়ার পক্ষ থেকে সর্বপ্রথম মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করার সৌভাগ্য অর্জন হয় আফগানিস্তানের প্রসিদ্ধ ন্যায়পরায়ণ শাসক সুলতান মাহমুদ গজনবির।(মৃত্যু:৪২১হি.)

তিনিই ৪১০হিজরিতে তাঁর এলাকা- গাজনোর আরুসুল মুলক”عروس الملك”
নামক মাসজিদের পাশে ইতাহাসের সর্বপ্রথম এই নিয়মতান্ত্রিক মাদরাসার সূচনা করেন৷

তারই ক্রমধারয়৩০/৫/১৮৬৬ইং,۱۵/۱/۱۲۸۳ হিজরি সনে বৃহস্প্রতিবার ছাত্তা মাসজিদের আঙ্গিনায় ছোট্ট একটি আনার গাছের ছায়ায় একই নামের দুজন ছাত্র-উস্তাদ দিয়ে দারুল উলুম দেওবন্দের সূচনা হয়৷ ছাত্র ছিলেন মাহমুদ হাসান রহ. পরবর্তি শাইখুল হিন্দ৷ আর উস্তাদ ছিলেন মোল্লা মাহমু দদেওবন্দী রহ.

সেই দারুল উলুম আজ বিশ্বের এক অবিস্মরণীয় প্রতিষ্ঠান৷ যুগে যুগে বাতিলের মুকাবিলা করে এসেছে এই দারুল উলুমের শিষ্যরাই৷মাধ্যমে আজও উপমহাদেশে ইসলামের পতাকা উড্ডীন হচ্ছে,হবে,ইন শাআল্লাহ৷
এই দারুল উলুম এমন একটি বৃক্ষ যার ফল আজ বিশ্বের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।এমন কোন রাষ্ট্র নেই যেখানে দারুল উলুমের সন্তান নেই৷ যার উদ্দেশ্য ইবক্বায়ে হাক্ব ইমহায়ে বাতিল৷ উপমহাদেশে মাদারিসের মূলভিত্তি এরই মাধ্যমে শুরু হয়৷

সেই মাদারে ইলমী দারুল উলুমে কে না আসতে চায়? আল্লাহর হাজারও শোকর তিনি আমাকে দারুল উলুমের ছাত্রত্ব  গ্রহণের  সুযোগ করে দিয়েছেন। এই দারুল উলুমের প্রতিটি বিষয় আমাকে আকর্ষণ করেছে৷ যুগিয়েছে এক অনন্য প্রেরণা।শিখিয়েছে কেমন করে কন্ট্রোল করতে হয়, দেখিয়েছে কেমন পরিচালানা করতে হয়৷
এই জামিয়া আসলেই অতুলনীয়।

এক নজরে দারুল  উলুম

১. দারে জাদিদ জাদিদ ২.দারে জাদিদ ক্বাদিম ৩. রাওয়াকে খালিদ নামে তিনটি ভবন, (একটি দোতলা,দুটি তিন তলা বিশিষ্ট।) ৪দারুল কুরআন ক্বাদিম, ৫. ইহাতায়ে মুলসেরি, ৬. ইহাতায়ে মাসজিদে ক্বাদিম,৭ দারুল হাদিস তাহতানি, ৮.শাইখুল হিন্দ মানযিল(ওরফেঃ-আ’জমি মানযিল), ৯. আফরিকি মানযিল ১০. জাদিদ মাতবাখ, ১১শাইখুল ইসলাম মানযিল(উরফে:- আসামি মানযিল)১২ শায়খ থানবী রাহ মানযিল,(ওরফে:- দারুল কুরআন) ১৩. জাদিদ লাইব্রেরী,দারুল ইমতিহান ১৪. ছানুবিয়া দরসগাহ ১৫. দফতরে ইহতিমাম,দারুল ইকামা,ও তা’লিমাত, ১৬. দারুশ শেফা ১৭. মাসজিদে রাশিদ, ১৮. মাসজিদে ক্বাদিম ১৯. মাসজিদে ছাত্তা৷ এসব ভবন নিয়ে এক দৃষ্টিনন্দন পরিবেশ তৈরি করে রেখেছে। শতশত দর্শক প্রতিদিনএই স্বপ্নের দারুল উলুমকে দেখতে আসে প্রতিনিয়ত।

দারুল উলুমে প্রায় ৩০ টি শু’বা (বিভাগ)  রয়েছে৷এবং শু’বায়ে তা’লিমাতে রয়েছে প্রায় ১৬টি দরজাত(স্তর)৷
এই দারুল উলুমের দাখিলাপ্রাপ্ত ছাত্রদের সংখ্যা প্রায় ৪০০০৷ আর উস্তাদ,মুলাযিম,খাদিমদের সংখ্যা প্রায় ৩০০র কাছাকাছি,৷ উস্তাদদের সংখ্যা, ১০১। ইলমি শু’বার জিম্মাদার সংখ্যা, ১৮। ইন্তেজামি শু’বার জিম্মাদার, ১৮।
এছাড়া জিম্মাদরগন ব্যতীত আরো শতের উপরে মুলাযিম,খাদেম আছেন৷ সব মিলিয়ে প্রায় ২৫০-৩০০এর কাছিকাছি পৌছাবে৷ শুধু দারুল উলুমের দারোয়ানের সংখ্যা প্রায়২০এর কাছাকাছি৷

দারুল উলুমের ছাত্রদের প্রতি উদারতা

দারুল উলুম ছাত্রদের প্রতি যেই উদারতা দেখায় তা আমার মনে হয় উপমহাদেশের কোথাও পাওয়া যাওয়া বিরল।
১- সেই ভর্তি হতে নিয়ে আজ পর্যন্ত দারুল উলুম ছাত্রদের কাছে না এক টাকা চেয়েছে না একটাকা নিয়েছে৷ এক কথায় দালিখা ইমতিহানের জন্যে সেই ১০০টাকার ফরম ছাড়া আর কোন টাকা দিতে হয়নি৷
২- দারুল উলুম ছাত্রদের থেকে নেই না৷ বরং ছাত্রদের দেয়৷ প্রতিমাসে প্রত্যেক ছাত্রকে সর্বনিম্ম ২০০ টাকা করে ভাতা দেয়৷
৩- দারুল উলুম প্রত্যেক ছাত্রকে নিয়মিত দুবেলা খাবার দেয় সকাল বেলা খুব গাঢ় ডাল সাথে উন্নতমানের দুটি করে রুটি। বিকালে প্রতিদিন মহিষের গোস্ত সাথে রুটি৷ আর সাপ্তাহে এককেজি করে বিরিয়ানী, যার স্বাদ বলার মতো নয়৷
৪- গরমকালে প্রত্যেক ভবনের পাশে ঠান্ডা পানির ফ্রিজের ব্যবস্থা৷
৫- আর এই কনকনে শীতে গরম পানির ব্যবস্থা৷
৬ এই শীতে প্রত্যেক ছাত্রকে ভালো উন্নত মানের কম্বলের ব্যবস্থা৷
৭ প্রত্যেহ দুইবার বাথরুম,গোসলখানা,উযুখানা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা৷
৮:-চব্বিশঘন্টা বিদ্যুতের ব্যবস্থা৷
৯- প্রত্যেক ছাত্রকে একটা একটা আলমারি৷
১০- দারে জাদিদ জাদিদ ও দারুল কুরআনে ছাত্রদের জন্যে খাটের ব্যবস্থা৷
১১- ছব্বিশটা ঘন্টা টাংকি ভর্তি পানির ব্যবস্থা৷ আমি এখানে আসার পর থেকে আজ পর্যন্ত কোন এক মিনিটের জন্যেও পানি বন্ধ হতে দেখিনি৷
১২:- বিনা পয়সায় কিতাব বিতরণ৷
১৩- প্রত্যেক ছাত্রের জন্যে বিশাল একটা সিটের ব্যবস্থা৷ ভালো ছাত্রদের জন্যে বিশেষ কারমরার ব্যবস্থা৷
১৪- প্রত্যেক এরিয়ায় সুবিশাল অযুখানা টয়লেটের ব্যবস্থা৷
১৫- প্রত্যেক এরিয়ায় জন্যে পৃথক পৃথক গোসলখানা৷
১৬- প্রত্যেক এরিয়ায় কাপড় ধৌতকরার জন্যে পৃথক জায়গা নির্ধারণ৷ইত্যাদি ইত্যাদি।

প্রত্যেকটা বিষয় মনমুগ্ধকর, চিত্তাকর্ষকঅ যা মোটেও ভুলার নয়৷মোটকথা বলা যায়, দারুল উলুম একটি ছাত্রর চলার পথে যতদিক প্রয়োজনীয়  সবদিকেই খেয়াল করে। এমন কোন প্রয়োজনীয় দিক নেই যা দারুল উলুম খেয়াল করে না৷

দারুল উলুম!! অবশেষে তোমাকে কী দিয়ে যে মুবারকবাদ জানাবো ভাষা নেই আমার৷ কিন্তু চিরদিন তুমি আমার হৃদয়ে থাকবে, তোমার প্রতিটি মুহূর্ত অমর হয়ে থাকবে স্মৃতির মিনারে। আসলে সত্যিই তুমি পুণ্যভূমি। তোমার তরে কত অসৌজন্যপূর্ণ কাণ্ড ঘটিয়েছি৷যদি ভুল করি কখনো ক্ষমা করে দিয়ো হে প্রিয়!

সম্পাদনা: হাওলাদার জহিরুল ইসলাম