মঙ্গলবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৭

ads

আহলে বাইতের ভালোবাসার নামে সীমালঙ্ঘন নয়!

OURISLAM24.COM
অক্টোবর ৩, ২০১৭
news-image

মুফতি মুহাম্মাদ রাশিদুল হক

রাজধানীর একটি অভিজাত বিপণীবিতানে গিয়েছিলাম কিছু কিনতে। এমন সময় তিন-চারজন বিদেশী মানুষ সেখানে প্রবেশ করলেন। গাইড একজন বাংলাদেশী। ক্রেতা-বিক্রেতাদের উদ্দেশ্যে ধর্মীয় কিছু কথা শুনিয়ে চললেন কিছুক্ষণ।

তাদের মধ্যে একজন ছিলেন তরুণ ছিলেন নেহাত সুদর্শন। তার ব্যক্তিত্ব ছিলো মুগ্ধ করার মত। পরিচয়ের সময় জানা গেল ওই তরুণর রাসূলুল্লাহ সা. এর বংশধর। তখন শ্রোতাদের একজন তার হাত উঠিয়ে নিজের ঠোঁটে স্পর্শ করতে উদ্যত হলেন। কিন্তু হাত ধরা মাত্র অজানা কোনো কারণে ওই তরুণ বিনয়ের সাথেই নিজেকে গুটিয়ে নিলেন।

রূপ, গুণ, অনুগ্রহ বা আত্মীয়তার বন্ধনের কারণে কারো প্রতি আকৃষ্টতাই ভালোবাসা। কিছু ভালোবাসা মানুষের স্বভাবগত। এই ভালোবাসা মানুষের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল নয়। আর কিছু ভালোবাসা মানুষের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। এ জাতীয় ভালোবাসাকে বুদ্ধি-ভিত্তিক ভালোবাসা বলা যায়।

ভালোবাসার আরেকটি প্রকারের নাম ঈমানী ভালোবাসা। (আইনির বরাতে ইজাহুল মুসলিম হদিস-৭০) অল্প সময়ের ব্যবধানে প্রিয় নবিজি সা. এর বংশধর অপরিচিত ওই তরুণের প্রতি যে ভালোবাসা জন্ম নিয়েছিলো সেটিকে ঈমানী ভালোবাসায় বিশেষায়িত করা যায়।

প্রকৃত অর্থে মুমিন হতে হলে ঈমানী ভালোবাসা নিজের মধ্যে ধারণ করা আবশ্যক। রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন- ‘তোমাদের কেউই ততক্ষণ পর্যন্ত (পূর্ণ) মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি তার কাছে তার সন্তান-সন্তুতি, পিতা-মাতা এবং অন্য লোকদের চাইতে অধিক প্রিয় হব। (মুসলিম-৭০)

শুধু নবিজীকেই নয়, নিজের ঈমানকে পাকা-পোক্ত ও টেকসই করতে আরো অনেককেই ভালোবাসতে হয়। এই ভালোবাসার তালিকায় প্রিয় নবি সা. -এর পৌত্রদ্বয় হযরত হাসান-হুসাইন রা. এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

তাঁদের দু’জনকে প্রিয় নবি সা. অত্যন্ত মুহাব্বত করতেন। তিনি শুধু নিজই তাঁদের ভালোবসতেন না, রবং উম্মতের সকল সদস্যকে তাঁদের মুহাব্বত করতে উৎসাহিত করেছেন। কোনো কোনো স্থানে তাঁদেরকে মুহাব্বতের বিনিময়ে মহান আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়ার সুসংবাদও দিয়েছেন প্রিয় নবিজি সা.।

হযরত বারা রা. বলেন, আমি হাসানকে রাসূলুল্লাহ সা. এর কাঁধের উপর দেখেছি। তখন তিনি বলেছিলেন, হে আল্লাহ! আমি একে ভালোবাসি। আপনিও তাকে ভালোবাসুন। (বুখারি- ৩৭৪৯)

হযরত আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সা. হযরত হাসান রা. কে লক্ষ করে বলেন- ‘আমি একে ভালোবাসি। আপনিও তাকে ভালোবাসুন। আর যে তাকে ভালোবাসে তাদেরকেও ভালোবাসুন।’ (মুসলিম-৬৪০৯)

হযরত উসামাহ রা. থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সা. তাঁকে এবং হাসান রা.-কে এক সাথে কোলে তুলে নিয়ে বলতেন- ‘হে আল্লাহ! আমি এদের দু’জনকে ভালবাসি, আপনিও এদেরকে ভালোবাসুন’। (বুখারি- ৩৫৩৭)

হযরত ইয়ালা রা. বলেন, রসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন- ‘হুসাইন আমার, আমি হুসাইনের। যে ব্যক্তি হুসাইনকে মুহব্বত করবে আল্লাহ তাকে ভালোবাসবেন’। (তিরমিজি -৩৭৭৫)

প্রিয় নবি সা. কে ভালোবাসা ঈমানের অঙ্গ। নবিজির সুগন্ধ গুল্ম তুল্য পৌত্রত্রদ্বয় হযরত হাসান-হুসাইন রা. এবং আহলে বাইতের মুহাব্বতও ঈমানে অন্যতম অংশ। তবে এ ভালোবাসা হতে হবে আল্লাহর তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষে। আল্লাহর জন্য কাউকে ভালোবাসা ঈমানের সম্পূরক।

রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন- ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কাউকে ভালোবাসে … সে ঈমান পূর্ণ করে।’ (আবু দাউদ: ৪৬৮১)

ইসলাম একটি পূর্ণঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। এতে সব বিষয়ের নির্দিষ্ট নীতিমালা আছে। রয়েছে সব কিছুর সীমা-রেখা। বাড়াবাড়ি এবং ছাড়াছাড়ি কোনোটাই ইসলাম সমর্থন করে না। সীমালঙ্ঘন ইসলামে গর্হিত ও পরিত্যাজ্য।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- ‘বনী ইসরাঈলের মধ্যে যারা কুফুরী করেছিলো তারা দাউদ ও মারইয়াম-তনয় কর্তৃক অভিশপ্ত হয়েছিলো। কারণ, তারা ছিলো অবাধ্য এবং সীমালঙ্ঘনকারী।’ (মায়িদা-৭৮)

কোনো নির্বোধ যদি ভালোবাসার নামে জায়াকে জননীর আসনে উন্নীত করে বসে, তাহলে তা যেমন সমাজের দৃষ্টিতে জঘণ্য কাজ, তেমনি ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও তা একটি গর্হিত কর্ম। এমন বিবেকশূন্য মানুষের জন্য ইসলামে মোটা অংকের আর্থিক দণ্ডের বিধান রয়েছে।

শরিয়তে পরিভাষায় এটিকে ‘জিহার’ বলে। এব্যাপার আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- ‘যারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে ‘জিহার’ করে এবং পরে ওই উক্তি প্রত্যাহার করে, তাহলে একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে একটি দাস মুক্ত করতে হবে…। (সূরা মুজাদালা-৩)

প্রিয় নবি সা. প্রতি সম্মান-মর্যাদা উম্মতের প্রতিটি সদস্যের অন্তরে থাকা স্বাভাবিক। মহান আল্লাহর পরেই তাঁর স্থান। কিন্তু ভালোবাসার নাম করে কোনো নির্বোধ যদি তাঁকে আল্লাহ তাআলার সমপর্যায়ভুক্ত করতে চায়, তাহলে তা হবে সীমালঙ্ঘন।

এমন কাজ করতে স্বয়ং নবিজি সা.ও নিষেধ করেছেন। তিনি সাহবায়ে কেরামকে লক্ষ করে বলেন- ‘বনি ইসরাঈলের লোকেরা যেমন ঈসা ইবনে মারইয়াম আ. এর সীমাতিরিক্ত প্রশংসা করেছে, (খোদার আসনে বসিয়েছে) তোমার আমার ক্ষেত্রে তেমনটি করো না। বরং তোমরা আমাকে ‘আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রসূল’ বল (ডাক)। (বুখারী-৬৪৪২)

আম্মাজান আয়েশা রা. বলেন- ‘রাসূলুল্লাহ সা. আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন আমরা যেন প্রত্যেককে তার প্রাপ্য মর্যাদা দিই’। (সহীহ মুসলিম: পৃ-৪)

ইমাম মুসলিম রহ. ব্যক্তিকে প্রাপ্য মর্যাদার অধিক সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত করার অসারতা প্রসঙ্গে উল্লিখিত বাণীটি উদৃত করেছেন। সব মানুষ এক সবপর্যয়ের সম্মানী হয় না। ব্যক্তিভেদে মান মর্যাদার হ্রাস-বৃদ্ধি হয়।

তাই সবাইকে নিজ নিজ প্রাপ্য সম্মানে ভূষিত করাই বাঞ্ছনীয়। মর্যাদা একটি আপেক্ষিক বিষয়। অপেক্ষাকৃত কম সম্মানের অধিকারী ব্যক্তিকে তার প্রাপ্য সম্মানের বেশি দিলে তার চেয়ে অধিক সম্মানের অধিকারীকে খাট করা হয়। এটা সীমালঙ্ঘন।

নাসারা সম্প্রদায় হযরত ঈসা আ.কে রেসালাতের সুমহান মর্যাদা থেকেও আরো অধিক মর্যাদা (!) দিতে গিয়ে তাঁকে স্রষ্টার আসনে বসিয়ে ছিলো। এভাবেই তারা সীমালংঘনের নিপতিত হয়। পরিশেষে আল্লাহ তাআলার অভিসম্পাতের শিকার হয়।

ঠিক এমনিভাবে ইসলামের পোষাকে একদল মানুষ হযরত হাসন-হুসাইন রা. এর তথাকথিত ভালোবাসার দোহাই দিয়ে অন্যান্য সাহাবায়ে কেরামকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে ফিরছে দূর অতীত থেকে। এমন কি তথাকথিত ভালোবাসার কাছে মহান আল্লাহর হুকুমও মূল্যহীন এই সম্প্রদায়ের কাছে।

পূণ্যভূমি মক্কা-মদিনায় পবিত্র হজ চলাকালে মহান আল্লাহকে ডাকার পরিবর্তে হযরত হুসাইন রা. কে ডেকে ফিরে তারা। ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা!’ -এর পরিবর্তে বলতে থাকে ‘লাব্বাইকা ইয়া হুসাইন!’।

হযরত হুসাইন রা. এর ইন্তেকালের দীর্ঘ চৌদ্দশ’ বছর পর কার ডাকে সাড়া দেয় তারা? হযরত হুসাইন রা. কি জীবদ্দশায় কখনোও মুসলিম নামধারী শিয়া সম্প্রদায়কে পূণ্যভূমি মক্কা-মদিনায় আহবান করেছেন? তাহলে কল্পিত কোন ‘হুসাইনে’র ডাকে সাড়া দেয় তারা?

মহান আল্লাহর ডাকের চেয়েও কি কল্পিত সেই আহবান আরো গুরুত্ববহ? ভালোবাসার নামে নাসারাদের চেয়েও ভয়ানক সীমালঙ্ঘনকারীদের পরিণাম তাদের চেয়েও ভয়াবহ হবে কিনা তা মহান আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন।

ভালোবাসার নামে এই জাতীয় সীমালঙ্ঘনের অশঙ্কাতেই সম্ভবত প্রিয় নবিজি সা. এর তরুণ ওই বংশধর হস্তচুম্বনের উদ্দেশ্যে ধারণ করা নিজের হাতটি সবিনয়ে গুটিয়ে নিয়েছিলেন।

লেখক: মুহাদ্দিস, গবেষক।