বুধবার, ২২ নভেম্বর ২০১৭

ads

রোহিঙ্গা শিবিরের হিরো : সালাহুদ্দীন মাসউদ

OURISLAM24.COM
সেপ্টেম্বর ১৭, ২০১৭
news-image

সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর
অতিথি লেখক, আওয়ার ইসলাম

‘দুর্গম পথ পেরিয়ে আমরা হোয়াইক্যং সীমান্তের নিকটবর্তী এলাকায় চলে গেলাম। এদিক দিয়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে প্রবেশ করার জন্য অপেক্ষা করছিলো। তারা ক্ষুধার্ত, পীপাসার্ত হয়ে কাতরাচ্ছিলো।

তাদের দেখে আমরা বিস্কুট এবং পানি নিয়ে সীমান্তের দিকে এগিয়ে গেলাম। যদিও এ কাজটি অনেক ঝুঁকিপূর্ণ ছিলো, কিন্তু মজলুম মানুষের চিৎকার কানে আসার নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলাম না। পানির বোতল দেখে তারা ‘পানি পানি…’ বলে মুখ হা করে আমাদের ডাকছিলো।

তাদের শীর্ণ চিৎকার শুনেই বুঝতে পারছিলাম তারা কয়েকদিনের অভুক্ত, হয়তো পেটে দু-এক ঢোক পানিও পড়েনি। তাদের কাছে গিয়ে আমরা তাদের মুখে পানি ঢেলে দিচ্ছিলাম। বিস্কুট খাইয়ে দিচ্ছিলাম। এটুকু সামান্য পানি আর বিস্কুট পেয়েই আনন্দে তাদের চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরতে লাগলো। তাদের কান্না দেখে আমরাও কাঁদছিলাম।

এইটুকু সামান্য সাহায্য দিয়ে যে কারো মুখে এমন হাসি ফোটানো যায়, জীবনেও কখনো ভাবিনি। সবকিছু ছেড়ে আসা অসহায় মুসলিমদের পাশে দাঁড়ানোর ওই মুহূর্তের আনন্দানুভূতি প্রকাশ করার সাধ্য আমার নেই। শুধু বলবো, এটা ছিলো আমার পঁয়ত্রিশ বছর জীবনের শ্রেষ্ঠ অনুভূতি। জীবনে আর কোনো কিছুতে এতোটা আনন্দ পাইনি।’

প্রবেশ মুখেই শিশুদের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা

মুসলিম রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে এভাবেই নিজের অনুভূতি প্রকাশ করছিলেন বিশিষ্ট লেখক ও সম্পাদক বগুড়ার মুফতি সালাহুদ্দীন মাসউদ। খুব সামান্য সাধ আর সাধ্য নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের দুর্দশার বাস্তব চিত্র দেখতে গিয়েছিলেন গত এক সপ্তাহ আগে। কিন্তু সেখানে গিয়ে বাস্তবতার যে ভয়াবহ ছায়াছবি নিজের চোখের সামনে ঘটতে দেখলেন, তা ছিলো তার ভাবনার অতীত।

গিয়েছিলেন সরেজমিনে শরণার্থীদের দুর্দশা দেখতে, কিন্তু লক্ষ মানুষের গগনবিদারী আর্তনাদ আর হাহাকার মুহূর্তে তাঁকে বানিয়ে ফেলেছিলো একজন আত্মদানে দুঃসাহসী এক যোদ্ধা। তিনি সেই যুদ্ধের একজন দুঃসাহসী সৈনিক।

গতকাল দুপুরে যখন তাঁকে ফোন দিলাম, মনে হলো অনেক ব্যস্ত। গলার আওয়াজ শুনে বুঝা যাচ্ছিলো, ক্লান্তি তাঁকে ঘিরে ধরেছে। জিজ্ঞেস করলাম- ‘কী করছিস দোস্ত? ব্যস্ত নাকি?’

শারীরিক ক্লান্তি একদিকে সরিয়ে রেখে জোরালো কণ্ঠে বললো, ‘টেকনাফ থেকে এলাম দু’দিন হলো। তিন-চারদিন পর আবার যাচ্ছি। তবে এবার যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়ে যাচ্ছি। বগুড়া থেকে চাল-ডাল, পানির জন্য টিউবয়েল, গৃহস্থালি আসবাব, ওষুধ-পথ্য, বাচ্চাদের জন্য শিশুখাদ্যসহ প্রয়োজনীয় অনেক জিনিসপত্র কিনতে বাজারে এসেছি।’

‘আবার কবে যাবি?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি।

‘আগামী মঙ্গলবার ইনশাআল্লাহ। এবার আশা করছি বড় ধরনের কালেকশন হবে বগুড়া থেকে। বাংলাদেশের মানুষ রোহিঙ্গাদের জন্য নিজেদের সর্বস্ব উজাড় করে দিচ্ছে। এর কোনো তুলনা নেই দোস্ত।’

‘সার্বিক পরিস্থিতি বিষয়ে তোর অভিজ্ঞতা কেমন?’

‘এককথায় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় যাকে বলে। এটা ওখানে না গেলে বুঝা যাবে না। মানুষ কতো অসহায় হয়ে আছে সেখানে। অনেক সম্ভ্রান্ত পরিবারের নারী-পুরুষ আছেন, কয়েকদিন আগেও তারা কোটিপতি ছিলেন।

কিন্তু আজ তারা সব হারিয়ে নিঃস্ব। কাল হয়তো স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখী সংসার ছিলো, কিন্তু আজ সব আগুনের লেলিহান শিখায় দাউ দাউ করে জ্বলছে। চোখের পানি ফেলা ছাড়া আর কিছুই করবার নেই তাদের।

আমরা অনেকেই মনে করছি, রোহিঙ্গারা হয়তো গরিব বা ফকির টাইপের মানুষ। এ কারণে বাইরে থেকে যারা ত্রাণ দিতে আসে তারা অনেকেই তাদের সঙ্গে ভিক্ষুকের মতো আচরণ করে। কিন্তু এখানে আগত অধিকাংশ রোহিঙ্গাই বেশ সম্ভ্রান্ত পরিবারের মানুষ। ভাগ্যের বিপর্যয় তাদের এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন করেছে। অনেক সম্ভ্রান্ত নারী আছেন যারা সীমান্ত পার হয়ে এসেছেন বটে, তবু ক্ষুধার তাড়নায় মরে গেলেও কারো কাছে হাত পাতে না। এটা তাদের আত্মসম্মানে লাগে। এরা একাকী বসে শুধু অশ্রুপাত করেন। কিন্তু আমরা তাদের ফকির-মিসকিন ভেবে তাদের দিকে ত্রাণের প্যাকেট ছুঁড়ে মারি। এরকম করা ঠিক নয়। তাদের যথেষ্ট সম্মান করা উচিত।’

Image may contain: 1 person, beard, grass, sky, outdoor and nature

ত্রাণের দল ছুটে চলছে ধানক্ষেত পাড়ি দিয়ে

‘সেখানকার শরণার্থীরা কীভাবে সীমানা পার হয়ে বাংলাদেশে আসছে? তোর পর্যবেক্ষণ কী?’

‘আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলি। আমাদের যাওয়ার দ্বিতীয় দিন সংবাদ পেলাম, শাহপরীর দ্বীপে অনেক শরণার্থী আটকা পড়ে আছে। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম শাহপরী যাবো। শাহপরীর দ্বীপের আগে আরেকটি ছোট নদী আছে। শরণার্থীরা দলে দলে নদী পার হয়ে এ পাড়ে আসছে কিন্তু ভাড়ার অভাবে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে অনেকেই ক্যাম্পে যেতে পারছে না। আমরা তাদের জন্য গাড়ি ঠিক করে ভাড়া পরিশোধ করে দিলাম। অনেকের হাতে নগদ টাকাও দিয়ে দিলাম যাতে অনাগত পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে।

ওখানে গিয়ে আরও জানতে পারলাম, অনেক নারী ও শিশু এ নদীর অপর পাড়ে ভাড়ার অভাবে আটকে আছে। আমরা দ্রুত নৌকা নিয়ে গিয়ে আটকে পড়াদের নগদ টাকা দিলাম নৌকায় পার হওয়ার জন্য। পুরো দ্বীপে মানুষ গিজ গিজ করছে, যাকে যেভাবে পারলাম নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করতে চেষ্টা করলাম। দ্বীপের এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত হেঁটে শরণার্থীদের সাহস যোগাতে লাগলাম। তাদের বললাম, ভয় পাওয়ার কিছু নেই।

আমরা সতেরো কোটি বাংলাদেশি আছি আপনাদের পাশে। আর একটা প্রাণও না খেয়ে মারা যাবে না। আমরা জীবিত থাকতে বাংলাদেশের সীমানায় আপনাদের অভুক্ত হয়ে মরতে দেবো না।

ওখান থেকে আসার পর সবসময় রোহিঙ্গাদের অসহায় ‍মুখগুলো তাড়া করে ফিরছে। কিন্তু আমাদের সমবেদনা তাদের কোনো কাজে আসবে না। তাদের জন্য প্রয়োজন অর্থসাহায্য, বাসস্থানের ব্যবস্থা করা, বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা। এ কারণে ফিরে এসেছি আবার ভালো করে প্রস্তুতি নিয়ে যেতে।’

‘এবার কতো দিনের জন্য যাবি?’

‘কতো দিনের জন্য যাবো সেটা তো বলতে পারবো না, তবে যখন মনে হবে এবার কিছুটা হলেও নিজের বিবেকের দায়বদ্ধতা শোধ করতে পেরেছি তখনই কেবল এ যুদ্ধ থেকে হাতিয়ার গুটাবো। বিবেকের চেয়ে বড় কোনো আদালত তো নেই দোস্ত। প্রতিটা মুহূর্তে রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের ক্ষুধাক্লিষ্ট যন্ত্রণাকাতর মুখগুলো ভেসে উঠে। বাড়িতে এসে ভাত খেতে বসলে প্রায়ই ভাত গলায় আটকে যায়। মনে হয়, দেখে আসা সেই বাচ্চাটা কি আজ রাতে খেতে পেরেছে? সেই নারী বা বৃদ্ধলোকটির পেটে কি আজ দু-এক লোকমা অন্ন জুটেছে? এসব ভাবলে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারি না।

ঘরে স্ত্রী অসুস্থ, কিন্তু লাখো শরণার্থী নারী না খেয়ে মারা যাচ্ছে। কী করে বসে থাকবো বল? আমি থাকতে পারছি না বলে বাচ্চাদের স্কুল-মাদরাসা অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। কিন্তু হাজার হাজার নিষ্পাপ শিশু এক বোতল পানির তাড়নায় ছটফট করছে। তারাও তো মানুষ, আমাদেরই সন্তান!’ সালাহুদ্দীনের গলা ধরে আসে।

সালাহুদ্দীন মাসউদ আট শ মাইল পাড়ি দিয়ে টেকনাফ থেকে ফিরে এসেছেন বগুড়ায় নিজের বাড়িতে। নিজের স্ত্রী-সন্তানদের কাছে। কিন্তু এ ফিরে আসা লড়াই থেকে পিছু হটা নয়, বরং প্রবল বিক্রমে আবার ঝাঁপিয়ে পড়ার রণকৌশল। হৃদয়ের দরদ দিয়ে যে অসহায় মানুষের চোখের অশ্রুর ভাষা বুঝতে পারে, সত্যিকারের যোদ্ধা সে-ই। তার ভালোবাসার দামেই তো লেখা হবে আগামী পৃথিবীর মানবতার ইতিহাস।

সে-ই আমাদের হিরো। আমাদের রিয়েল হিরো।

রোহিঙ্গা শিবিরের হিরো : গাজী ইয়াকুব