বৃহস্পতিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০১৮

ads

ইজারার মাধ্যমে বিনিয়োগের হুকুম ও নীতিমালা

OURISLAM24.COM
জুন ২৮, ২০১৭
news-image

মুফতি মুহাম্মাদ শোয়াইব

ইসলামী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো মুরাবাহার পর যে বিনিয়োগটি বেশি করে থাকে, তা হচ্ছে ইজারা বা লিজিং। এটি ইসলামী অর্থনীতিতে মৌলিক কোনো বিনিয়োগ পদ্ধতি নয়, বরং বিজ্ঞ মুফতিরা ইসলামী ব্যাংকিং শুরু হওয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সাময়িকভাবে এর অনুমতি দিয়েছিলেন।

ইজারা বৈধতার ব্যাপারে রাসুল সা. এর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, নবী সা.) এর সহধর্মিণী আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, (হিজরতের ঘটনায়) তিনি বলেন, রাসুল সা. এবং আবু বকর রা. বনুদিল গোত্রের এক অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে পথ দেখিয়ে দেয়ার জন্য মজদুর নিয়োগ করেন। লোকটি কোরাইশ-কাফেরদের ধর্মাবলম্বী ছিল। তারা দুইজন (নবী সা. ও আবু বকর রা.) নিজ নিজ সওয়ারি তার কাছে সোপর্দ করলেন এবং এ মর্মে প্রতিশ্রুতি নিলেন, তিন রাত পর তৃতীয় দিন সকালবেলা তাদের সওয়ারি সাওর পাহাড়ের গুহায় নিয়ে আসবে। (বুখারি : ২১২১)। এ হাদিসটি ইজারা বৈধতার স্পষ্ট প্রমাণ বহন করে।

‘ইজারা’ শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো কোনো জিনিস ভাড়ায় প্রদান করা। ইসলামী ফিকহের পরিভাষায় ইজারা পৃথক দুটি পদ্ধতির জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

১. প্রথম পদ্ধতি হলো ইজারা অর্থ কোনো ব্যক্তি থেকে শ্রম গ্রহণ করা, যার বিনিময়ে তাকে বেতন-ভাতা প্রদান করা হবে। এটিকে (আল ইজারাতু আলাল আমাল) বলে। ইংরেজিতে এটিকে Hiring workers for their labor বলে। এ পদ্ধতিতে যিনি শ্রম গ্রহণ করবেন, তাকে ‘মুস্তাজির’ বা ইজারাদার ও যিনি শ্রম দেবেন, তাকে ‘আজির’ বা শ্রমিক বলা হয়। যেমন রাশেদ কোনো কুলিকে তার মালামাল এয়ারপোর্টে পৌঁছে দেয়ার জন্য ভাড়ায় নিল। তাহলে রাশেদ হলো ‘মুস্তাজির’ আর কুলি হলো ‘আজির’। উভয় পক্ষের মাঝে সাব্যস্তকৃত লেনদেনকে ‘ইজারা’ বলা হচ্ছে। এ ধরনের ইজারায় যে ‘আজির’ বা শ্রমিক নিয়োগ করা হয়, তাকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়।

(ক) আল আজিরুল খাস : ‘আল আজিরুল খাস’ বলা হয় তাকে, যিনি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য শ্রম বা সেবাদানের চুক্তিতে আবদ্ধ হন। ওই সময়ে তিনি অন্য কাউকে শ্রম দিতে পারবেন না। বরং চুক্তিবদ্ধ পূর্ণ সময়কাল মুস্তাজিরের কাজেই তাকে ব্যস্ত থাকতে হবে। যেমন কোনো ব্যক্তি অপর কাউকে মাসিক বেতনের ভিত্তিতে অফিসে ম্যানেজার হিসেবে রাখল। অথবা নির্দিষ্ট সময় ছাগল চড়ানোর জন্য কাউকে ভাড়ায় নিয়োগ করল ইত্যাদি।

(খ) আল আজিরুল মুস্তারিক : ‘আল আজিরুল মুস্তারিক’ বলা হয় তাকে, যিনি একই সময়ে একাধিক ব্যক্তিকে সেবা বা শ্রম দান করে থাকেন। যেমন ডাক্তার, আইনজীবী, শিক্ষক বা এমন ব্যক্তি যিনি একই সময়ে একাধিক ব্যক্তিকে সেবা দান করে থাকেন। বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন, (আল-হেদায়া : ৩/২৩৯, আল-মুহাজ্জাব : ১/৭৭, হাশিয়াতুদ্দাসুকি : ৪/২২, আল-মুগনি : ৬/৮২-৮৮-২৭)।

২. ইজারার দ্বিতীয় প্রকার হলো, যা কোনো মানবীয় সেবার সঙ্গে সম্পর্ক রাখে না। বরং আসবাবপত্র ও সম্পদের সুবিধা ভোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত। অর্থাৎ নিজ মালিকানাধীন কোনো জিনিসের সুযোগ-সুবিধা অন্য কাউকে এমন কোনো ভাড়ার বিনিময়ে হস্তান্তর করা যে, যা তার থেকে দাবি করা যায়। এখানেও ‘মুুজির’, ‘মুস্তাজির’ ও ‘উজরাত’ পরিভাষাগুলো বিদ্যমান রয়েছে। ইংরেজিতে একে Leasing বলা হয়। আর এ ধরনের ইজারাই বর্তমানে অর্থায়ন পদ্ধতি হিসেবে ব্যাপকভাবে গ্রহণ করা হচ্ছে।

ইসলামী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ইজারাকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে ব্যাপকভাবে গ্রহণ করছে। যেমন ধরুন, হারুন সাহেবের গাড়ি কেনার প্রয়োজনে কোনো সুদি ব্যাংকের কাছে ঋণের জন্য গেলে ব্যাংক তাকে সুদভিত্তিক ঋণ দিয়ে গাড়ি কেনার ব্যবস্থা করে দেবে। কিস্তিতে সে ব্যাংককে সুদসহ টাকা পরিশোধ করবে। পক্ষান্তরে ইসলামী ব্যাংকের কাছে গেলে ইসলামী ব্যাংক তাকে সুদি ঋণ না দিয়ে গাড়ি নিজেই কিনে তাকে একটি দীর্ঘমেয়াদে, যেমন ৩ থেকে ৫ বছরের মেয়াদে ভাড়ায় দেবে। ভাড়া নির্ধারণ করার সময় তারা খেয়াল করেন, যাতে নির্দিষ্ট সময়ে লাভসহ বিনিয়োগ ওঠে আসে। মেয়াদ পার হওয়ার পর গাড়িটি নামেমাত্র মূল্যে বা মূল্য ছাড়াই গ্রাহকের কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়। এভাবে ইসলামী ব্যাংক কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইজারাকে অর্থায়ন পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করে থাকে।

কিন্তু বর্তমানে এ পদ্ধতিতে ব্যাপকভাবে শর্ত লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। লিজ গ্রহিতার অমনোযোগিতা বা ত্রুটি ছাড়া লিজকৃত পণ্যের কোনো ক্ষতি হলে এর দায়দায়িত্ব লিজদাতার ওপর বর্তাবে, এক্ষেত্রে গ্রহিতা থেকে ক্ষতিপূরণ নেয়া যাবে না। কিন্তু ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে এ শর্ত ব্যাপকভাবে লঙ্ঘন করা হয়, যা কারও অজানা নয়। এমনিভাবে একটি মেয়াদে প্রদান করার পর মধ্যখানে একক সিদ্ধান্তে ভাড়া বাড়িয়ে দেয়াও নিষিদ্ধ। কিন্তু এ শর্তও পুরোপুরি পালন করা হয় না।

নিম্নোক্ত কয়েকটি শর্তসাপেক্ষে বিজ্ঞ মুফতিরা ইজারাকে অর্থায়ন পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করা জায়েজ বলেছেন।

১. ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান যে গাড়িটি ভাড়ায় দিচ্ছে তা ভাড়াকালীন মালিকানার সব দায়দায়িত্ব বহন করতে হবে। গাড়িটি গ্রাহকের কোনো অসতর্কতা ও অমনোযোগিতা ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত হলে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান তার ক্ষতি বহন করবে।

২. ইজারা দেয়ার সময়ই ভাড়া সুস্পষ্টভাবে জানাতে হবে এবং ভবিষ্যতে বাড়ানো বা কমানোর স্পষ্ট নীতিমালা উভয় পক্ষের কাছে সুস্পষ্ট থাকতে হবে।

৩. ইজারার সময় এ শর্ত থাকতে পারবে না যে, নির্ধারিত মেয়াদ শেষে গাড়িটি ইজারা গ্রহিতার কাছে নামেমাত্র মূল্যে বিক্রয় বা মূল্যহীন দান করে দেবে।

৪. ইজারাসংক্রান্ত অন্যান্য সব শর্ত মান্য করতে হবে।

লেখক : সম্পাদক, মাসিক আরবি ম্যাগাজিন, ‘আলহেরা’