আমিনুল ইসলাম হুসাইনী
'দৌলতপুর' ইতিহাসের পাতায় প্রজ্বলিত একটি গ্রামের নাম। রূপসী বাংলার আরো শত সহস্র গ্রামের মতোই একটি গ্রাম। আর সব গ্রামের মতো এখানেও বিস্তৃত সবুজ ধানের খেতে ঢেউ তুলে বসন্তের দখিণা হাওয়া। কৃষকের মাথার উপর সুদূর নীলিমায় ভেসে বেড়ায় শরতের সাদা মেঘ। বর্ষায় খালে-বিলে গান গেয়ে দাঁড় টেনে যায় মাঝি মাল্লার দলেরা। হেমন্তে গ্রামের কিশোরী আর নয়া বধূদের ব্যস্ততা চোখে পড়ে অন্যসব গ্রামের মতোই। সবইতো সাদাসিধা!
তাহলে কি আর এমন বিশেষত্ব বাকি আছে এই গ্রামের? যে বিশেষত্বের জন্যে ইতিহাসের পাতায় নিজেকে প্রকাশ করে দৌলতপুর অর্জন করেছে এক অনন্য গৌরব। কি সেই মহারত্ন? কে সেই পরশপাথর? যার স্পর্শে দৌলতপুরের মতো সাধারণ একটি গ্রাম আজ সোনায় সোহাগা।
কে সেই যাদুর বাঁশরী? যার মোহন বাঁশীর সুরে দোলায়িত হয়েছিল এই অজপাড়া গায়ের মানুষগুলোর তনু মন। যার প্রেমবসন্তের উতলা হাওয়া কাপন ধরিয়েছিল এক ইরানী পুষ্পের চিত্তে।
তিনি যে আর কেউ নন, তিনি হলেন প্রেমের কবি, দ্রোহ ও সাম্যবাদের কবি। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
কবি ১৯২১ সালের এপ্রিল মাসে (১৩২৭ চৈত্র) সর্বপ্রথম এই দৌলতপুর গ্রামে এসেছিলেন। শুধু আসাই নয়, দীর্ঘ ৭০ দিন অবস্থানের যে স্মৃতি মিশে আছে এই গ্রামের আলো-ছায়া, বৃক্ষ-লতা আর পত্রপল্লবে, তাকি কখনো মুছে যাওয়ার? নাকি ভুলে যাওয়ার?
না, তা কখনো ভুলার নয়। এই স্মৃতি ভুলতে পারেননি কবি নিজেও। নজরুল যেখানেই থাকুক না কেন, প্রিয়তমা নার্গিসের অমর প্রেমের স্মৃতি কবিকে তাড়া করেছে সবসময়। যে কথা কবি নিজেই বলে গেছেন তার মনের মানুষ নার্গিসকে লেখা চিঠিতে।
তিনি লিখেছেন- 'যেখানেই থাকি বিশ্বাস করো আমার অক্ষয় আশির্বাদ কবচ তোমায় ঘিরে থাকবে।'
প্রিয় পাঠক! আসুন তাহলে জেনে নেই সেই অমর প্রেমের স্মৃতি বিজড়িত কবি তীর্থ দৌলতপুরে কবি আগমনের প্রেক্ষাপট, এবং ফিরে যায় কবির সেই ৯৫ বছর আগেকার দিনগুলোতে। যেখানে আমতলা থেকে ভেসে আসবে কবির বাঁশির সুর। কিম্বা দেখা যাবে কোনো এক জানালায় দাঁড়িয়ে থাকা ইরানি পুষ্প, লাজনম্র নার্গিসের মুখ।
১৯২০ সাল। কবি হিসেবে নজরুল তখন মোটামুটি খ্যাতির আসনে সমাসীন। সে সময় তাঁর সঙ্গে পরিচয় ও কিছুটা ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে প্রকাশক আলী আকবর খানের। আলী আকবর খান কবিকে তাঁর গ্রামের বাড়ি দৌলতপুরে বেড়াতে যাওয়ার প্রস্তাব করেন। কবি তখন নবযুগ পত্রিকার কাজে ইস্তফা দিয়ে অবসর সময় পার করছেন। তাছাড়া উড়ন্ত স্বভাবটাওযে মিশে রয়েছে কবির রক্তের সাথে। কবি সহসা খানের প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলেন। অতঃপর ১৯২১ সালের এপ্রিল (১৩২৭ চৈত্র) মাসে আলী আকবরের সাথে কবি নজরুল সর্বপ্রথম মুরাদনগরের দৌলতপুরে পা রাখেন।
তখনকার সময়ে এলাকায় খান বাড়ির যথেষ্ট সম্মান ও প্রভাব প্রতিপত্তি ছিল। আলী আকবরের নির্দেশে কবির আগমন উপলক্ষ্যে তোরণ সাজানো হয়। ফুল ছিটিয়ে বরণ করা হয় কবিকে।
কবিকে থাকতে দেওয়া হয় পুকুরের ধারে একটি বৈঠকখানায়। আলী আকবরের বিধবা বড় বোন এখতা