মঙ্গলবার, ২৪ এপ্রিল ২০১৮

স্বীকৃতির চলমান প্রক্রিয়ায় : তিন শিক্ষাবিদ আলেমের মিশ্র প্রতিক্রিয়া

OURISLAM24.COM
এপ্রিল ৫, ২০১৭
news-image

333আতাউর রহমান খসরু : লক্ষ কওমি তরুণের অপেক্ষা অবসান ঘটিয়ে সনদের স্বীকৃতি আসছে ১১ এপ্রিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা করবেন কওমি শিক্ষা সনদের স্বীকৃতি । একাধিক সূত্র জানিয়েছে, অাগামী মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আলেমদের সমাবেশে এই ঘোষণা করার কথা রয়েছে। তবে স্বীকৃতির রূপরেখা বা আইনি ভিত্তি কী হচ্ছে তা এখনও স্পষ্ট বলতে পারছেন না কেউ।

স্বীকৃতির চলমান প্রক্রিয়া নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে কওমি ধারার শিক্ষা গবেষক আলেমদের মাঝে। তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে আশা, আশঙ্কা ও সংশয়। দেশের শীর্ষ তিন আলেম শিক্ষাবিদের সাথে কথা বললে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন তারা।

স্বীকৃতির চলমান প্রক্রিয়া নিয়ে কথা বলেছিলাম, সমাজ বিশ্লেষক ও  শিক্ষাবিদ মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী, শায়খ যাকারিয়া রহ. ইসলামিক রিসার্চ সেন্টারের  প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মুফতি মিযানুর রহমান সাঈদ ও মাদরাসাতুল হুদা প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মাওলানা আবদুর রাজ্জাক নদভী-এর সঙ্গে।

কওমি সনদের স্বীকৃতির চলমান প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দেশের খ্যাতিমান আলেম, গবেষক ও শিক্ষাবিদ মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভি। প্রথমেই কাছে জানতে চেয়েছিলাম স্বীকৃতিকে কীভাবে দেখছেন? উত্তরে শিক্ষা গবেষক এ আলেম বলেন, দেখার তো সুযোগ পেলাম না। মূল্যায়ন করবো কীভাবে? বাচ্চা না হওয়া পর্যন্ত তো বলা যাচ্ছে না তা ছেলে, না মেয়ে বা হিজড়া। স্বীকৃতি হওয়ার পর বলা যাবে তা কেমন হলো। স্বীকৃতি আমাদের অনুকূলে হলো নাকি প্রতিকূলে হলো।

তাহলে শুধু স্বীকৃতিতে সন্তুষ্ট হতে পারছেন আপনি? না, কোনো কিছু না জেনে সন্তুষ্ট হবো কি করে? স্বীকৃতি যদি কওমি ধারার উলামা ও তোলাবার প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়, তাহলে তো ভালো। আর যদি তাতে শুধু সরকারের নিয়ন্ত্রণই বাড়ে তাহলে স্বীকৃতি অভিশাপও হতে পারে।

অন্যদিকে স্বীকৃতিতেই আশঙ্কা আছে মাওলানা আবদুর রাজ্জাক নদভীর। তিনি বলেন, ‘আমাদের উলামাগণ বরাবর স্বীকৃতিতে অনীহা দেখিয়েছেন। স্বীকৃতির কিছু উপকার হয়তো আছে। কিন্তু আমাদের আগামী প্রজন্মের উপর তার প্রভাব কী পড়বে তা নিয়ে যথেষ্ট ভয় রয়েছে।’

এ ক্ষেত্রে স্বীকৃতি লিঁয়াজো কমিটির উপর আস্থা রাখতে মুফতি মিযানুর রহমান সাঈদ। তিনি বলেন, আমি আশাবাদী কারণ আমাদের মুরব্বি আল্লামা আহমদ শফীর নেতৃত্ব কওমি মাদরাসার প্রতিনিধিত্বকারী পক্ষগুলো একমত হতে পেরেছেন এবং এখনো পযন্ত এক সঙ্গেই কাজ করে যাচ্ছেন। আমার জানা মতে তাদের মাঝে কোনো মতভিন্নতা তৈরি হয় নি।

শুধু তাই নয়; তিনি স্বীকৃতির চলমান প্রক্রিয়ার উপর মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকদের আস্থা রাখার আহবান জানিয়ে বলেন, ‘যেহেতু হাটহাজারির হজরতের সম্মতিতে এবং তার নির্দেশনা মোতাবেক সবকিছু অগ্রসর হচ্ছে। তাই এর মাধ্যমে আমরা উপকৃত হবো ইনশাআল্লাহ’।

তবে কী আস্থা নেই মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভীর? যেসব শীর্ষ আলেম এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত তাদের উপর কী আস্থা রাখতে পারছেন না তিনি? উত্তরে বলেন, উনাদের আমার আমার আস্থা রয়েছে। এটা ঠিক আস্থার প্রশ্ন না। তথ্যগুলো সর্ব শ্রেণীর আলেমদের জানিয়ে করলে পর্যালোচনার সুযোগ থাকতো। আমার মনে হয়, স্বীকৃতি হওয়ার পূর্বে জাতীয় পর্যায়ে একটি উলামা সম্মেলন করে স্বীকৃতির রূপরেখা তুলে ধরা দরকার ছিলো। মতামত ও পরামর্শ নেয়া দরকার ছিলো।

কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, ‘ধরুন! স্বীকৃতি হলো কিন্তু আমরা যেভাবে চাই সেভাবে হলো না। তার চেয়ে বড় বিপদ আর থাকবে না। তখন সরকার বলবে, আপনাদের সম্মতিতেই সব হয়েছে।’

অন্যদিকে মাওলানা আবদুর রাজ্জাক নদভীর কেনো আশঙ্কা করছেন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘আমি ছোট্ট একটি ঘটনাই শুধু উল্লেখ করবো। ভারতের স্বাধীনতা লাভের পর মাওলানা আবুল কালাম আজাদ নদওয়াতুল উলামাকে একটি সরকারি কলেজে পরিণত করতে চেয়েছিলেন। তখন তাকে বলা হয়েছিলো, ‘ইতিহাসে যেমন লেখা আছে মাওলানা মুহাম্মদ আলি মুঙ্গেরি রহ. নদওয়ার প্রতিষ্ঠাতা। ঠিক তেমনি লেখা থাকবে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ নদওয়ার হত্যাকারী।’

‘এখন আমরা একভাবে স্বীকৃতি নিচ্ছি এবং এক সরকার স্বীকৃতি দিচ্ছে। কিন্তু পরবর্তী প্রজন্ম পরবর্তী সরকার থেকে কতোটা নিরাপদ থাকতে পারবে না নিয়ে যথেষ্ট চিন্তার অবকাশ আছে।’

কওমি ধারার উলামায়ে কেরামের মনে আশঙ্কায় আরেকটি দিক হলো এবারের স্বীকৃতিও শুধু ঘোষণা সর্বস্ব হয়ে থাকবে, নাকি পরিণত কিছু অপেক্ষা করছে তাদের জন্য। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকেই তাদের এই আশঙ্কা। মাওলানা উদায়দুর রহমান খান নদভীও এ ক্ষেত্রে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করার দাবি জানান। তিনি বলেন, স্বীকৃতি যদি ঘোষণা ও প্রজ্ঞাপনে আঁটকে থাকছে কী না? একটি জিনিস আইন হওয়ার কয়েকটি ধাপ রয়েছে। মন্ত্রীসভায় পাশ হওয়া, সংসদের অনুমোদন, রাষ্ট্রপতির অনুমোদন ও  রাষ্টীয় প্রজ্ঞাপন ইত্যাদি। আমাদের যে স্বীকৃতি দেয়ার কথা হচ্ছে তা কোন পর্যায়ে যেয়ে শেষ হবে তা স্পষ্ট হওয়া দরকার।

কিন্তু এ ক্ষেত্রেও বেফাক ও লিঁয়াজো কমিটির উপর আস্থাশীল মাওলানা মিযানুর রহমান সাঈদ । তিনি বলেন, শুধু প্রজ্ঞাপন হোক বা কওমি শিক্ষা আইনে পরিণত হোক, কওমি কর্তৃপক্ষের নামে হোক বা ছয় বোর্ডের অধীনে হোক যেহেতু শীর্ষ আলেমদের মতামত ও সম্মতিতেই হচ্ছে, তাই তা নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। যদি উলামায়ে কেরাম ঐক্যবদ্ধ থাকেন তবে তা সুফলই বয়ে আনবে।

ভয়, শঙ্কা ও সংশয় যাই থাকুক না কেনো কওমি পড়ৃয়া লক্ষ তরুণের স্বপ্ন সত্য হোক কল্যাণকর পথে সেই প্রত্যাশায় করছি।

আরও পড়ুন : প্রস্তুতি সম্পন্ন; কওমি স্বীকৃতির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ১১ এপ্রিল

স্বীকৃতি বিষয়ে উচ্চতর বৈঠক: সনদের স্বীকৃতি দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি খুব শীঘ্রই

স্বীকৃতি: থাকছে বেফাকের আধিপত্য