শুক্রবার, ২২ মে ২০২৬ ।। ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ ।। ৫ জিলহজ ১৪৪৭


মসজিদ কি স্থানান্তর করা যায়? ইসলাম কী বলে?

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

আহমাদ ইউসুফ শরীফ
আলেম ও শিক্ষক

tara mosjidসম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার প্রয়োজনে ধর্মীয় স্থাপনা স্থানান্তরের বিধান রেখে আইন পাস করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

তবে শর্ত হলো, ‘জনপ্রয়োজনে বা জনস্বার্থে একান্ত অপরিহার্য হলে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ক্ষেত্রে ব্যক্তি বা সংস্থার অর্থে স্থানান্তর ও পুনর্নির্মাণ সাপেক্ষে কেবল উক্ত সম্পত্তি অধিগ্রহণ করা যাবে।’

এর ব্যাখ্যায় বলা হয়, ‘অর্থাৎ, রাস্তার উপর একটা মসজিদ পড়ে গেল, অপসারণ না করলে রাস্তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে তখন এটাকে সরিয়ে রিলোকেট করে মসজিদ পুনর্নির্মাণ করে রাস্তাটা করা যাবে।”

সামরিক শাসনের সময় জারি করা ১৯৮২ সালের একটি অধ্যা দেশ উচ্চ আদালতের নির্দেশে বাংলা করে নতুন করে এই আইন করা হচ্ছে বলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান।

সেই আইনে ধর্মীয় উপাসনালয়, কবর বা শ্মশানের জমি অধিগ্রহণের কোনো সুযোগ ছিল না। নতুন আইন জাতীয় সংসদে পাস হলে কার্যকর হবে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, সরকারিভাবে জমি অধিগ্রহণে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ জমির দামের দেড়গুণ থেকে বাড়িয়ে তিনগুণ এবং বেসরকারিভাবে জমি অধিগ্রহণে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ চারগুণ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

এখন আসুন আমরা মসজিদ স্থানান্তরের মাসআলা নিয়ে আলোচনা করি।

মসজিদ স্থানান্তরের মাসআলায় যাওয়ার আগে জানতে হবে, মসজিদের জমির ওয়াকফের সুরত সহি কিনা।

ওয়াকফের সুরত
আলী ইবনু হুজর রহ. ইবনু উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণণা করেন; তিনি বলেন, খায়বারে উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু’র একখণ্ড জমি লাভ হয়। তিনি বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি খায়বারে কিছু মাল লাভ করেছি। এর চেয়ে উত্তম মাল আমি কখনো পাইনি। আপনি এ বিষয়ে আমাকে নির্দেশ দিন? তিনি বললেন, ইচ্ছে করলে, মালটি ওয়াকফ করে এর উৎপাদিত ফল-ফসল সাদকা করে দিতে পার। তারপর উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু এই মর্মে তা ওয়াকফ করে দেন যে, মূল ভূমি বিক্রি করা যাবে না। তিনি তা দরিদ্র, নিকট আত্মীয়, গোলাম আযাদ করা, মুসাফির, মেহমান ও আল্লাহ পথে সাদকা করে দেন। ন্যায়ভাবে তা থেকে খেতে বা বন্ধুদের খাওয়াতে এর মুতাওয়াল্লীর জন্য কোন পাপ হবে না। তবে শর্ত হলো এ থেকে যেন সম্পদশালী হওয়ার প্রয়াস না পায়।

حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ حُجْرٍ، أَنْبَأَنَا إِسْمَاعِيلُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ، عَنِ ابْنِ عَوْنٍ، عَنْ نَافِعٍ، عَنِ ابْنِ عُمَرَ، قَالَ أَصَابَ عُمَرُ أَرْضًا بِخَيْبَرَ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَصَبْتُ مَالاً بِخَيْبَرَ لَمْ أُصِبْ مَالاً قَطُّ أَنْفَسَ عِنْدِي مِنْهُ فَمَا تَأْمُرُنِي قَالَ ‏ "‏ إِنْ شِئْتَ حَبَسْتَ أَصْلَهَا وَتَصَدَّقْتَ بِهَا ‏"‏ ‏.‏ فَتَصَدَّقَ بِهَا عُمَرُ أَنَّهَا لاَ يُبَاعُ أَصْلُهَا وَلاَ يُوهَبُ وَلاَ يُورَثُ تَصَدَّقَ بِهَا فِي الْفُقَرَاءِ وَالْقُرْبَى وَفِي الرِّقَابِ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ وَالضَّيْفِ لاَ جُنَاحَ عَلَى مَنْ وَلِيَهَا أَنْ يَأْكُلَ مِنْهَا بِالْمَعْرُوفِ أَوْ يُطْعِمَ صَدِيقًا غَيْرَ مُتَمَوِّلٍ فِيهِ ‏.‏ قَالَ فَذَكَرْتُهُ لِمُحَمَّدِ بْنِ سِيرِينَ فَقَالَ غَيْرَ مُتَأَثِّلٍ مَالاً ‏.‏ قَالَ ابْنُ عَوْنٍ فَحَدَّثَنِي بِهِ رَجُلٌ آخَرُ أَنَّهُ قَرَأَهَا فِي قِطْعَةِ أَدِيمٍ أَحْمَرَ غَيْرَ مُتَأَثِّلٍ مَالاً ‏.‏ قَالَ إِسْمَاعِيلُ وَأَنَا قَرَأْتُهَا عِنْدَ ابْنِ عُبَيْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ فَكَانَ فِيهِ غَيْرَ مُتَأَثِّلٍ مَالاً ‏.‏ قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ ‏.‏ وَالْعَمَلُ عَلَى هَذَا عِنْدَ أَهْلِ الْعِلْمِ مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم وَغَيْرِهِمْ لاَ نَعْلَمُ بَيْنَ الْمُتَقَدِّمِينَ مِنْهُمْ فِي ذَلِكَ اخْتِلاَفًا فِي إِجَازَةِ وَقْفِ الأَرَضِينَ وَغَيْرِ ذَلِكَ
صحيح البخاري: كتاب الوصايا: باب الوقف كيف يكتب؟: حديث رقم 2646

উপরোক্ত হাদিসসহ অন্যন্য মূলনীতির আলোকে বাংলাদেশ সরকার ওয়াকফ সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্যে ১৯৬২ সালে ওয়াকফ অধ্যাদেশ -১৯৬২ জারী কারে। ওয়াকফ বলতে অধ্যাদেশের ২ ধারায় বলা হয়েছে, কোন মুসলমান কর্তৃক ধর্মীয়, পবিত্র বা দাতব্য কাজের উদ্দেশ্যে তার স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি স্থায়ীভাবে উৎসর্গ করাকে বুঝায়।

ওয়াকফের উপাদানসমূহ নিম্নরুপ
১. ওয়াকফের উদ্দেশ্যে সম্পত্তি উৎসর্গ করতে হবে।
২. ওয়াকফ ধর্মীয় বা দাতব্য উদ্দেশ্যে হতে হবে।
৩. ওয়াকফের উদ্দেশ্যে সম্পত্তি উৎসর্গ অবশ্যই চিরতরেও হতে হবে।
৪. ওয়াকিফকে উৎসর্গকৃত সম্পত্তি বৈধ মালিক হতে হবে।
৫. ওয়াকিফকে প্রাপ্তবয়ষ্ক ও সুস্থ মতিষ্ক হতে হবে।
৬. ওয়াকফ অবশ্যই শর্তমুক্ত হতে হবে।

হানাফি মাজহাবে এই সমস্ত বৈধ শর্তাবলি পাওয়া গেলে মসজিদ স্থানান্তর জায়েজ হবে না।

قال الحنفية : للمسجد بمجرد القول ( أي الوقف ) على المفتى به صفة الأبدية، فلا تنسلخ عنه صفة المسجدية ولو استغني عنه، فلو خرب المسجد وليس له ما يعمر به، وقد استغنى الناس عنه لبناء مسجد آخر، يبقى مسجداً عند أبي حنيفة وأبي يوسف أبداً إلى قيام الساعة، وبرأيهما يفتى، فلا يعود إلى ملك الباني وورثته، ولا يجوز نقله ونقل ماله إلى مسجد آخر، سواء أكانوا يصلون فيه أم لا.( حاشية ابن عابدين 3\408 ، فتح القدير:5\58 ، البدائع: 6\338)

মসজিদ যদি সরকারি জায়গা বা ওয়াকফকৃত নয় এমন জায়গায় হয়?

সরকারি যায়গায় মসজিদ বা ঈদের মাঠ বানানোর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে অনুমতি লাগবে। সরকারি অনুমতি ছাড়া সেই স্থান মসজিদ বা ঈদের মাঠ বলে সাব্যস্ত হবে না, যেহেতো সকল স্থানেই ঈদ ও অন্যান্য নামায পড়া যায়েজ, তাই প্রশ্নে উল্লেখিত স্থানে ঈদের নামায সহীহ হয়ে যাবে। কিন্তু তা শরয়ী ঈদগা’ বলে ততক্ষণ সাব্যস্ত হবেনা,যতক্ষণ না সরকারি এতদ সংক্রান্ত মন্ত্রণালয় কর্তৃক বিধিবদ্ধ আইন অনুযায়ী মৌখিক বা লিখিত অনুমোদন না নিবে। ওয়াক্ফ হবার জন্য লিখিত অনুমোদন জরুরি নয়। তবে লিখিত অনুমোদন নিয়ে নেয়াই উচিত। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মূল মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন না নিয়ে কেবল সাধারণ কর্মচারী বা অফিসারের মৌখিক অনুমোদন গ্রহণযোগ্য নয়। ঠিক একই বিধান সরকারি সকল স্থান ও জনসম্পত্তির ক্ষেত্রে। তবে সরকারি জায়গায় বিনানুমতিতে নির্মিত ধর্মীয় বা সাধারণ স্থাপনা উচ্ছেদে সরকার বৈধ ক্ষমতা রাখে।

فى الدر المختار- لا يجوز التصرف فى مال غيره بلا اذنه ولا ولايته ( الدر المختار مع الشامى -9/291 وفى شرح المجلة- لا يجوز لأحد ان يتصرف فى ملك غيره بلا اذنه او وكالته او ولايته عليه وان فعل كان ضامنا( شرح المجلة-1/262) الْخَامِسُ مِنْ شَرَائِطِهِ الْمِلْكُ وَقْتَ الْوَقْفِ حَتَّى لَوْ غَصَبَ أَرْضًا فَوَقَفَهَا ثُمَّ اشْتَرَاهَا مِنْ مَالِكِهَا وَدَفَعَ الثَّمَنَ إلَيْهِ أَوْ صَالَحَ عَلَى مَالٍ دَفَعَهُ إلَيْهِ لَا تَكُونُ وَقْفًا لِأَنَّهُ إنَّمَا مَلَكَهَا بَعْدَ أَنْ وَقَفَهَا هَذَا عَلَى أَنَّهُ هُوَ الْوَاقِفُ أَمَّا لَوْ وَقَفَ ضَيْعَةَ غَيْرِهِ عَلَى جِهَاتٍ فَبَلَغَ الْغَيْرَ فَأَجَازَهُ جَازَ بِشَرْطِ الْحُكْمِ وَالتَّسْلِيمِ البحر الرائق :كتاب الوقف: شرائط الوقف 5/203 ( الشاملة)

তবে ইবনে তাইমিয়া রহ. তার মাজমুউল ফাতাওয়া কিতাবে বিশেষ প্রয়োজনে ও সরকারি নির্দেশে স্থানান্তরের পক্ষে একটি মত ও মতের স্বপক্ষে নিম্নোক্ত দলিল পেশ করেছেন।

ওমর রা.-এর যুগে কূফার দায়িত্বশীল ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রা.। একদা মসজিদ থেকে বায়তুল মাল চুরি হয়ে গেলে সে ঘটনা ওমর রা.-কে জানানো হয়। তিনি মসজিদ স্থানান্তর করার নির্দেশ দেন। ফলে মসজিদ স্থানান্তরিত করা হয় এবং পূর্বের স্থান খেজুর বিক্রির বাজারে পরিণত হয়

وَأَمَّا إبْدَالُ الْمَسْجِدِ بِغَيْرِهِ؛ لِلْمَصْلَحَةِ مَعَ إمْكَانِ الِانْتِفَاعِ بِالْأَوَّلِ: فَفِيهِ قَوْلَانِ فِي مَذْهَبِ أَحْمَدَ. وَاخْتَلَفَ أَصْحَابُهُ فِي ذَلِكَ؛ لَكِنَّ الْجَوَازَ أَظْهَرُ فِي نُصُوصِهِ وَأَدِلَّتِهِ. وَالْقَوْلُ الْآخَرُ لَيْسَ عَنْهُ بِهِ نَصٌّ صَرِيحٌ؛ وَإِنَّمَا تَمَسَّكَ أَصْحَابُهُ بِمَفْهُومِ خَطِّهِ؛ فَإِنَّهُ كَثِيرًا مَا يُفْتِي بِالْجَوَازِ لِلْحَاجَةِ وَهَذَا قَدْ يَكُونُ تَخْصِيصًا لِلْجَوَازِ بِالْحَاجَةِ وَقَدْ يَكُونُ التَّخْصِيصُ لِكَوْنِ ذَلِكَ هُوَ الَّذِي سُئِلَ عَنْهُ وَاحْتَاجَ إلَى بَيَانِهِ. وَقَدْ بَسَطَ أَبُو بَكْرٍ عَبْدُ الْعَزِيزِ ذَلِكَ فِي " الشَّافِي " الَّذِي اُخْتُصِرَ مِنْهُ " زَادُ الْمُسَافِرِ " فَقَالَ: حَدَّثَنَا الْخَلَّالُ ثَنَا صَالِحُ بْنُ أَحْمَدَ ثَنَا أَبِي ثَنَا يَزِيدُ بْنُ هَارُونَ ثَنَا الْمَسْعُودِيُّ عَنْ الْقَاسِمِ قَالَ: لَمَّا قَدِمَ عَبْدُ اللَّهِ ابْنُ مَسْعُودٍ - رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ - عَلَى بَيْتِ الْمَالِ كَانَ سَعْدُ بْنُ مَالِكٍ قَدْ بَنَى الْقَصْرَ وَاِتَّخَذَ مَسْجِدًا عِنْدَ أَصْحَابِ التَّمْرِ. قَالَ فَنُقِبَ بَيْتُ الْمَالِ فَأَخَذَ الرَّجُلُ الَّذِي نَقَبَهُ فَكَتَبَ إلَى عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ فَكَتَبَ عُمَرَ: أَنْ لَا تَقْطَعْ الرَّجُلَ وَانْقُلْ الْمَسْجِدَ وَاجْعَلْ بَيْتَ الْمَالِ فِي قِبْلَتِهِ فَإِنَّهُ لَنْ يَزَالَ فِي الْمَسْجِدِ مُصَلٍّ. فَنَقَلَهُ عَبْدُ اللَّهِ فَخَطَّ لَهُ هَذِهِ الْخُطَّةَ
مجموع الفتاوى:كتاب الوقف: فصل: في حكم إبدال المسجد بغيره للمصلحة مع إمكان الانتفاع بالأول: 31/215،216
الله اعلم بالصواب

সহায়ক সূত্রাবলিঃ মাসিক আলকাউসার, আহলে হক মিডিয়া, প্রথম আলো, জাতীয় ই-তথ্য কোষ, শামেলা লাইব্রেরী

মসজিদ-মন্দির-মাদরাসাসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ করতে পারবে সরকার

add-our


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ