বুধবার, ১৭ জানুয়ারি ২০১৮

ads

রহস্যময়ী ভাষা ও বাংলাভাষায় মুসলমানদের অবদান

OURISLAM24.COM
ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০১৭
news-image

aminul_islamআমিনুল ইসলাম হুসাইনী

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর নিপুণ শিল্পকুশলতার অপরূপ এই সৌন্দর্যের পৃথিবীতে মানবজীবনকে যে সকল নেয়ামত দ্বারা পরিপূর্ণতা দান করেছন, করেছেন সৃষ্টির সেরা জীব। ‘ভাষা’ হচ্ছে সে সকল নেয়ামতের মধ্যে অন্যতম একটি নেয়ামত। মানবজীবনে ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। যার মুখে ভাষা নেই, সেই কেবল বুঝতে পারে ভাষার কি মূল্য! ভাষা যে শুধুমাত্র মনের ভাব প্রকাশ করেই চুপ করে বসে থাকে এমনটা নয়, বরং ভাষাই মানুষকে প্রকৃত মানুষে রুপান্তরিত করে। করে সভ্য ও সামাজিক। ভাষাই বলে দেয় কে মানুষ অার কে অমানুষ। ভাষার মধ্য দিয়েই মানুষের ঘুমন্ত চিত্ত লালিত-পালিত হয়, হয় সুপ্ত প্রতিভা বিকশিত। তাই মানবজীবনকে উন্নতকরণে ভাষার ভূমিকা অত্যধিক।

ভাষা আসলে কী?
এমন প্রশ্নের সহজ উত্তর হচ্ছে, ভাষা মহান আল্লাহ তায়ালার এক অনন্য সৃষ্টি। মানুষ তার মুখনিঃসৃত শব্দপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে মনের ভাবকে অন্যের কাছে প্রকাশ করে। মানুষের মুখে প্রচলিত এই ভাষার জন্ম হয়েছে পবিত্র জান্নাতে। যদিও এই ভাষার জন্ম ও স্রষ্টা নিয়ে ভাষাবীদদের মাঝে মত-দ্বীমতের শেষ নেই। তবে যে যাই বলুক না কেন, ভাষার স্রষ্টা যে একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামিনই, তা মুমিন মাত্রই নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করে নেন। কেন না পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘(তিনি) সৃষ্টি করেছেন মানুষ, তাকে শিখিয়েছেন ভাষা।’ ( সূরা রহমান : ৩-৪)

বৈচিত্র্যময়ী ভাষা প্রভুর নিদর্শন : বৈচিত্র্যময়ী এই পৃথিবীতে রয়েছে অসংখ্য ভাষা। যুক্ত রাষ্ট্র ভিত্তিক ‘সামার ইনষ্টিটিউট অব লিঙগুয়িস্টিক (এস আই এল)- এর অধীনে এথনোলগ- দ্য ল্যাংগুয়েজেস অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ নামের ভাষা সংক্রান্ত একটি প্রকাশনার ১৯৯৯ সালের জরিপে বলা হয়েছে, ‘পৃথিবীতে জীবন্ত ভাষার সংখ্যাই আছে প্রায় ৬ হাজারের অধিক।’ (সূত্র : ইন্টারনেট)

মজার ব্যাপার হলো, পৃথিবীতে এই যে অসংখ্য ভাষা, এই অসংখ্য ভাষার উচ্চারণগত ভিন্নতাও কিন্তু অসংখ্য রকমের। সেজন্যই ভাষার এই রহস্যময় ভূবনে রবীন্দ্রনাথ আশ্চর্য হয়ে বলেছিলেন, ‘ভাষার আশ্চর্য রহস্য চিন্তা করে বিস্মিত হয়।’ ভাষার এই বৈচিত্র্যতা যে, মানুষকে শুধুমাত্র আশ্চর্যই করে তা কিন্তু নয়। বরং বৈচিত্র্যময়ী এই ভাষা মানুষের জ্ঞানভাণ্ডারকে করে সমৃদ্ধি ও গতিশীল। কারণ এই ভাষায় রয়েছে চিন্তাশীলদের অনন্য উপাদান। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা সে কথাই বলছেন, ‘আর তাঁর আরও এক নিদর্শন হচ্ছে ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্যতা। নিশ্চয় এতে জ্ঞানীদের জন্য রয়েছে নিদর্শনাবলী।’ (সূরা রূম : ২২)

সবার অাগে মাতৃভাষা : তবে কথা হলো, এতো এতো ভাষার মধ্যে প্রত্যেক জাতির কাছে তার মাতৃভাষাই কিন্তু অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। কেন না মাতৃভাষায় মানুষ যেভাবে তার মনের কথা সহজে তুলে ধরতে পারে, অন্য ভাষায় তা পারে না। আর সে জন্যই ইসলাম মাতৃভাষাকে স্মরণ করে অপরিসীম গুরত্বের সাথে। মাতৃভাষা শিক্ষা ও বিকাশে ইসলামের রয়েছে অকুণ্ঠ সমর্থন। এর প্রমাণস্বরুপ রয়েছে অসংখ্য নবী-রাসূলগণের মহান জীবনী। যাঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন মাতৃভাষাভাষী। মাতৃভাষার প্রতি তাঁদের প্রেম ছিল অপ্রতুল। আর অামাদের প্রাণপ্রিয় রাসূল হযরত মুহাম্মদ সা. এর মাতৃভাষার প্রেম যে কত গভীর ছিল তা বলারও অপেক্ষা রাখে না। তা ছাড়া পবিত্র কোআনে স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা মাতৃভাষার গুরত্ব তুলে ধরে বলেছেন, ‘আমি সব পয়গাম্বরকেই তাঁদের স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি। যেন তাদের পরিস্কার বুঝাতে পারেন…।’ (সূরা ইবরাহিম : ৪)

বাংলাভাষায় মুসলমানদের অবদান : ইসলামের অাদর্শে উজ্জীবিত হওয়া মুসলমানগণই যে, পরম মমতায় বাংলাকে তাঁদের বুকে ধারণ করেছিলেন একথা নিঃসন্দেহেই বলা যায়। যদিও অনেকেই এ সত্যকে না জানার কারণে বলে থাকেন যে, পূর্বেকার মুসলমাগণ বাংলাভাষাকে অগ্রাহ্য করতেন। ইতিহাস তাদের সে কথাকে মিথ্যা প্রমাণিত করেছে বহু আগেই। ইতিহাস বলে, আমাদের দেশে ইসলাম প্রচারের নিমিত্তে আগত পীর-দরবেশগণ গ্রাম ও বিজন প্রান্তরে বসবাস করা মানুষের মুখের প্রচলিত দেশীয় ভাষা তথা বাংলাভাষাকেই আয়ত্ব করে ইসলাম প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। বাংলাভাষাভাষী মানুষের কাছে ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরতে তাঁরা বাংলা ভাষাকেই বেছে নিয়েছেন।

তার পরও যারা মুসলমানদের ওপর মিথ্যে রটায়, তাদের মুখের ওপর ছাই ছিটিয়ে দ্বীনেশ চন্দ্র সেন তার ‘বঙ্গভাষার ওপর মুসলমানদের প্রভাব’ শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছেন- ‘মুসলমান আগমনের পূর্বে বঙ্গভাষা কোন কৃষক রমণীর ন্যায় দীন হীন বেশে পল্লী কুটিরে বাস করিতে ছিল।
…ইতরের ভাষা বলিয়া বঙ্গভাষাকে পণ্ডিত মণ্ডলী দূর দূর করিয়া তাড়াইয়া দিতেন।

কিন্তু হীরা যেমন কয়লার খনির মধ্যে থাকিয়া জহুরীর আগমনের প্রতীক্ষা করে, বঙ্গভাষা তেমনিই কোন শুভ দিন, শুভ ক্ষণের জন্য প্রতীক্ষা করিতে ছিল। মুসলমান বাঙ্গালা ভাষায় সেই শুভ দিন,শুভ ক্ষণের সুযোগ আনয়ন করিল।’ (লেখকের বানানে পরিবর্তন আনা হয়নি) উপরের উদ্ধৃতি থেকে একথাই স্পষ্ট হয়ে গেল যে, মুসলমানরাই বাংলা ভাষাকে স্ব মহিমতাই সমুন্নত করেছেন।

আবার কেউ কেউ আছে, যারা প্রবল আক্রোশে ঢালাওভাবে বলে থাকে যে, পরবর্তীতে অালেমগণ বাংলাভাষা চর্চাকে অপছন্দ করতেন। তারাও যে ইতিহাসকে বিকৃত করছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। হ্যাঁ, একথা সত্য যে, কেউ কেউ আরবী ফারসিকে বাংলার চেয়ে একটু বেশিই গুরুত্ব দিতেন। কিন্তু তাই বলে যে সবাই-ই বাংলাকে অগ্রাহ্য করতেন এমনটা নয়। বরং বলা যায় যে, বাংলায় বাংলাভাষার বিকাশ সাধিত হয়েছে একমাত্র আলেমদের মাধ্যমেই। কেন না বাংলাদেশে সর্বপ্রথম বাংলাভাষায় সংবাদ পত্র প্রকাশ করে যিনি অমর কীর্তি রেখে গেছেন, তিনি ছিলেন একজন আলেম। তিনি হলেন মাওলানা আকরম খাঁ’। তিনিই এ দেশে সর্বপ্রথম বাংলাভাষায় সংবাদ পত্র প্রকাশ করেছেন। অথচ অামরা অনেকেই তা জানি না।

এমন অারো কতো তথ্যই যে আমাদের অজানা থেকে যাচ্ছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। এই যেমন পবিত্র কুরআনের বাংলা অনুবাদ নিয়েও আমরা একটি বড় ভুলের ওপর পড়ে আছি। কেউ যখন আমাদের প্রশ্ন করেন, ‘সর্বপ্রথম পবিত্র কোরআনের বাংলা অনুবাদ করেছেন কে?’ তখন আমরা ঠোটস্থ বলে দেই ‘গিরিশ চন্দ্র সেন।’ অথচ গিরিশ চন্দ্র সেনের ৭৩ বছর পূর্বেই রংপুরের কৃতি আলেম মাওলানা আমীরুদ্দীন বসনিয়াহ রহ. পবিত্র কুরআনের বাংলা অনুবাদ করে গেছেন। ( তথ্যসূত্র : সাহিত্য ও সাংবাদিকতা, শাহ আবদুল হালীম হুসাইনী) এমন অনেকেই আছেন, যাঁরা মাতৃভাষার জন্য ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। বিশেষত, নূর মুহাম্মদ আজমী,মাওলানা আহমদ আলী, মাওলানা আহমদ সাইদ, মাওলানা খাইরুল আনম খাঁ, মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী, মাওলানা সিদ্দীক আহমদ, মাওলানা মুস্তাফিজুর রহমান রহ. প্রমুখ লেখক,গবেষক ও সু সাহিত্যিকগণ। যাঁরা নিজেদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের হিরে জহরতে বাংলাভাষার ভাণ্ডারকে করে গেছেন সুসজ্জিত ও সমৃদ্ধ। যদিও তাঁদের অনেককেই হয়তো আমরা চিনি না, জানি না। অথচ তাদের সেই অক্লান্ত পরিশ্রমের কারণেই বাংলাভাষা আজ বিশ্ব দরবারে একটি সমৃদ্ধশালী ভাষাতে পরিনত হয়েছে।

বাংলাভাষায় ফের দুর্দিনের কালো ছায়া : অতিব দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, অাজ যেন বাংলাভাষার ওপর আবারো সেই দুর্দিনের কালো ছায়া নেমে এসেছে। বাংলা ভাষার আঙিনা আজ আবারো ভীনভাষার বিষক্রিয়ায় ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের শিক্ষা-সভ্যতা, সাহিত্য-সাংস্কৃতি সবকিছুতেই আজ হিন্দি আর ইংরেজি ভাষার আধিপত্য। আর এর মূলে রয়েছে বৈদেশিক স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো। ইতিহাস ঐতিহ্যের দিক থেকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষা, আমাদের বাংলা ভাষা। এই ভাষায় কথা বলে বিশ্বের ৩৫ কোটি মানুষ। এখন বলুন, এই ভাষার মানুষ কি কখনো অন্যভাষাকে প্রাধান্য দিয়ে হীনমন্যতাই ভুগতে পারে? না, পারে না। তাই আসুন! ১৯৫২ সনের যে আন্দোলনের মাধ্যমে অামরা মাতৃভাষাকে ফিরে পেয়েছি, সেই মাতৃভাষার মানকে অক্ষুণ্ণ রাখতে আবারো জেগে ওঠি। তবেই ভাষা শহিদদের বিদেহী আত্মা শান্তি পাবে। নতুবা শুধুমাত্র একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহিদ মিনারে পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে সত্যিকারের বাঙালি হওয়া যাবে না।

লেখক : ইমাম ও খতিব, বাইতুল মামুর জামে মসজিদ, মনিয়ন্দ, আখাউড়া।