২০১৭-০১-১৮

সোমবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

ইলমি অঙ্গনের নতুন ফিতনা: ‘মুক্ত গবেষণা’ ও ‘উন্মুক্ত সমালোচনা’

OURISLAM24.COM
news-image

মাওলানা মুহাম্মাদ লুতফেরাব্বী
মিশর থেকে

lutfe_rabbiশিল্পবিপ্লবের পর থেকে পৃথিবীজুড়েই প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রের ন্যায়  জ্ঞান আহরণের উপায়-পদ্ধতিও সহজলভ্য হচ্ছে প্রতিদিন। জাগতিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের পাশাপাশি ইসলামি জ্ঞান-ভাণ্ডারেও প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে। ওয়েবসাইট-ব্লগ, অনলাইন-অফলাইন লাইব্রেরির কল্যাণে ব্যক্তিগত উদ্যোগ ছাড়াও পত্রিকা, রেডিও, টিভিতে চলছে ইসলাম চর্চা। এতে বহুবিধ ফায়দা অর্জিত হলেও একটি রোগ মহামারির আকার ধারণ করেছে, তা হলো ‘মুক্ত গবেষণা’।

তাহকিক বা গবেষণা একটি প্রয়োজনীয় বিষয় এবং তা শরিয়তে কাম্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো, গবেষণা কে করবেন এবং এর নীতিমালা কী?

সাধারণভাবেই বুঝে আসে, কোন বিষয়ে গবেষণার অধিকার তারই আছে যে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষ ও পারদর্শী। তাছাড়া গবেষণা বলাই হয়, বিভিন্ন মতামত ও তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনার মাধ্যমে কোন সিদ্ধেন্তে উপনীত হওয়া। তাই শাস্ত্রে অদক্ষ, অনভিজ্ঞ লোকেরা যদি এসব ক্ষেত্রে অনধিকার চর্চা করে তবে তা বিবেক ও শরীয়ত উভয় দৃষ্টিতে নিন্দনীয়।

দুনিয়ার সাধারণ জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে আমরা খুব ভালভাবেই মানি যে একজন ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পর্কে ‘সুক্ষ্ম’ জ্ঞান রাখেন না (তবে এই বিষয়ে তার সমান পারদর্শিতা থাকলে ভিন্ন কথা)। এমনকি ডাক্তারি বিদ্যার সব শাখায়ও যে তার সমান দক্ষতা থাকবে না সেটাও অনুমেয়। যেমন, একজন নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ যে চর্মরোগ সম্বন্ধে ভাল জানবেন না এটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া এক বিষয়ের অনেক ডাক্তারের মাঝেও যে দক্ষতা-অভিজ্ঞতাগত পার্থক্য রয়েছে তাও সবাই মানে। তাই কোন নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ যদি হঠাৎ চর্মরোগের চিকিৎসায় নেমে পড়েন তাহলে ভুল সাজেশনের পাশাপাশি আইনি ঝামেলায়ও আটকে যাবেন। অনুরূপভাবে কেউ যদি শুধু ভক্তি-সুখ্যাতির বশে তার কাছে চিকিতসা নিতে যান তাহলেও লোকে তাকে পাগল বলবে।

দুনিয়াবি ক্ষেত্রে এই বাস্তবতা অনস্বীকার্য হলেও দ্বীন ও শরিয়তকে এমনই লাওয়ারিশ মনে করা হয়, এখানে যে কেউ নিজের মতামত ঠেসে দিতে উদগ্রীব। ‘আমি জানি না’ এই কথা এখানে বলতে কেউ প্রস্তুত নন।

বিশেষত বর্তমান সমাজে প্রয়োজনীয় আরবী ভাষা ও উসুলি জ্ঞানে অজ্ঞতা সত্ত্বেও বাংলা-ইংরেজি অনুবাদ নির্ভর কিছু বিশেষজ্ঞের আবির্ভাব ঘটেছে, যাদের গবেষণা অনেক ক্ষেত্রে সত্য ও বাস্তবতার বিকৃতি এবং ইলম ও জ্ঞান-পরিমণ্ডলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। একদিকে তারা শরীয়তের সর্বজন স্বীকৃত ও ঐক্যমতপূর্ণ বিষয়ে গবেষণার নামে সংশয় সৃষ্টি করছেন, অন্যদিকে ইজতেহাদি বিষয়ে নিজের মতামতকে চূড়ান্ত ও পর্যালোচনার ঊর্ধ্বে মনে করে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করছেন (অথচ এদুটি’ই প্রান্তিক পথ)।

হযরত উমর রা. এক মাসয়ালায় তার মত ব্যক্ত করে বলেন, ‘এটা আমার মত এবং মত সবার হতে পারে…’ (জামিউ’ বয়ানিল ইলম ২/৫৯)

আজকাল সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের পাতায় পাতায় নিত্য নতুন মাসয়ালার আলোচনা দেখা যায়। তার স্বপক্ষে নামিদামি সম্মানী ব্যক্তিদের নাম জুড়ে দেয়া হয়। ধীরেধীরে সেই আলোচনা বিতর্কে রূপ নেয়। শুরু হয় লাগামহীন সমালোচনা। কোন পক্ষই সমালোচনা-শাস্ত্রের সাধারণ রীতিনীতি সম্পর্কে অবগত না থাকায় অহেতুক নিন্দা–গালিগালাজ ও কখনো মিথ্যা দোষারোপ চলতে থাকে। এই ভয়ঙ্কর ব্যাধিটি ইদানিং এত মারাত্মক আকার ধারণ করেছে যে, পূর্বসূরি ইমাম ও আলেমগণও রেহায় পাচ্ছেন না তাদের নির্লজ্জ আক্রমণ থেকে। এই মুক্ত গবেষণা ও উন্মুক্ত সমালোচনা উভয়টিই ইসলাম ও উম্মাহর কল্যাণের পরিবর্তে ক্ষতিই বয়ে আনছে।

এই লাগামহীনতা বন্ধে গবেষণা ও সমালোচনার অধিকার নির্ধারণ ও নীতিমালার কঠোর প্রয়োগ প্রয়োজন।

ইসলাম নিয়ে গবেষণার জন্য মৌলিক যে কয়টি শর্ত রয়েছে তার অন্যতম হলো, আরবি ভাষা–ব্যকারণ, অভিধান ও সাহিত্যে পান্ডিত্ব থাকা। পাশাপাশি উলুমুল কুরআন, উলুমুল হাদিস, সীরাত ও তারীখ, ফিকহ–উসুলে ফিকহ, নাসেখ–মানসুখ, তারীখুত তাশরিঈ বা শরীয়তের বিধানের ক্রমবিন্যাস ও প্রাচ্য–প্রাশ্চাত্যে ইসলাম গবেষণার ইতিহাস ও পর্যালোচনা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকতে হবে।

শুধু ‘গবেষণার জন্য গবেষণা’ নয়; বরং দ্বীনী প্রয়োজন আছে অথবা শরীয়ত অনুমোদিত দুনিয়াবী কোন কারণ বিদ্যমান রয়েছে এমন বিষয়ে গবেষণা হতে হবে। বিষয়টি শরীয়তের সর্বজন স্বীকৃত ও ঐক্যমতপূর্ণ বিষয় নয়; বরং ইজতেহাদি হতে হবে, যেখানে একাধিক মতামতের অবকাশ রয়েছে। পাশাপাশি নিজের মতকে চূড়ান্ত মনে না করে উপযুক্ত সমালোচনা গ্রহন করার মানসিকতা থাকতে হবে।

অনুরূপভাবে সমালোচনার ক্ষেত্রেও যাচ্ছেতাই মানসিকতা পরিহার করে সহনশীল ও গঠনমূলক হতে হবে। আলোচিত বিষয়ের মৌ্লিক কিছু বিধি ও সীমারেখা তৈরি করে সেই মৌ্লিক বিধি ও সীমারেখার আলোকে উদ্দিষ্ট ব্যক্তি বা বিষয়ের বর্তমান বাস্তবতাকে স্বীকার করে গঠনমূলক সমালোচনা করতে হবে।

গঠনমূলক সমালোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল- ব্যক্তির নিয়ত বা উদ্দেশ্যের ব্যপারে সংশয় প্রকাশ না করা,বরং তার কাজের ভাল-মন্দের বিশ্লেষণ করা। বিশেষত যে ব্যক্তি বা বিষয়ের ‘বাহ্যিক’ ফায়দা সমাজে প্রতিয়মান তার সমালোচনার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন জরুরি। সেক্ষেত্রে ঢালাও মন্তব্যের পরিবর্তে তার ত্রুটিগুলি স্পষ্ট যুক্তির মাধ্যমে পরিষ্কার করে দিতে হবে দুই কারণে।

প্রথমত, মানুষ যাকে ভালবাসে তার বিরুদ্ধে কোন কথা সহজে কানে তুলতে চায় না। দ্বিতীয়ত, এ সকল ব্যক্তির ক্ষেত্রে ঢালাও মন্তব্য (নির্ভরযোগ্য হওয়া সত্বেও) সমালোচকের উপর থেকে মানুষের আস্থা কমিয়ে দেয়।

পাশাপাশি পাঠক-দর্শক-শ্রোতাদের পূর্ণ দায়িত্বসচেতনতার সাথে এই সমালোচনা গ্রহণ করা আবশ্যক। প্রতি উত্তর বা প্রতিবাদের সময় যেন এমন উক্তি-আচরণ প্রকাশ না পায় যা তার বক্তব্যকে সমান প্রশ্নবিদ্ধ করবে।

এভাবে সুস্থ গবেষণা ও সুস্থ সমালোচনা ইলমের অঙ্গনে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পরিবশ তৈরি করবে। লা-দ্বীনী ও বদদ্বীনীর এই যুগে উপযুক্ত ব্যক্তিবর্গ ইলমে দ্বীনের খেদমতে এগিয়ে আসুন, অযোগ্য গবেষকদের ফেতনা থেকে আল্লাহ উম্মাহকে হেফাজত করুন এই দোয়া করি।

তথ্যসূত্রঃ
আল ইতকান, জালালুদ্দীন সুয়ূতী রহঃ
আল বুরহান, জারকাশী রহঃ
উসুল ওয়া আদাবুন নাকদ, ডঃ বিলাল আব্দুল কারীম

লেখকঃ এমফিল গবেষক, ইসলামিক স্টাডিজ এন্ড এরাবিক অনুষদ, আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়, মিশর