শনিবার, ২১ এপ্রিল ২০১৮

দেওবন্দের ফতোয়ার প্রেক্ষিতে পাঠানো মাওলানা সা’দের চিঠি

OURISLAM24.COM
ডিসেম্বর ১৩, ২০১৬
news-image

deubond_fatawa-sad

[গত ৮ নভেম্বর দারুল উলুম দেওবন্দ বিশ্ব তাবলিগ মারকাজের আমির মাওলানা সা’দ সম্পর্কে একটি ফতোয়া প্রস্তুত করে। সেখানে তার বয়ানের বিতর্কিত কিছু বিষয় উল্লেখ করে তাকে রুজু করার আহবান করা হয়। সেইমতে তিনি ৩০ নভেম্বর দেওবন্দ বরাবর একটি পত্র পাঠান। কিন্তু এক সপ্তাহ পর্যালোচনার পর তার রুজুনামা গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত হয় এবং গত ৫ ডিসেম্বর ফতোয়াটি প্রচার করা হয়। এরপর মাওলানা সাদ সাহেব এর নামে একটি রুজুপত্র স্যোশাল মিডিয়া ও ভারতের বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশ পাচ্ছে। আওয়ার ইসলামেও বিষয়টি নিয়ে প্রচুর ফোনকল ও এসএমএস এসেছে। এর প্রেক্ষিতে মাওলানা সাদের ৩০ নভেম্বর দেয়া মুল পত্রটি আওয়ার ইসলামের পাঠকদের জন্য প্রকাশিত হলো। এটি অনুবাদ করেছেন মিশরের আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাওলানা মুহাম্মদ লুতফেরাব্বি। এই চিঠির জবাবে দেওবন্দের পত্র ও মাওলানা সালমান নদভীর অভিমত পর্যায়ক্রমে ছাপা হবে ইনশাআল্লাহ। -নির্বাহী সম্পাদক]

হজরত মাওলানা সাদ কান্ধলভী তার সাথে সম্পৃক্ত তাবলীগের অন্যান্য সাথীদের ব্যাপারে দারুল উলুম দেওবন্দের বয়ান এই সম্পর্কে নিযামুদ্দিন মারকাযের যিম্মাদারদের পক্ষ থেকে জরুরি কয়েকটি কথা

দারুল উলুমের বর্তমান বয়ানের কারণে দাওয়াত ও তাবলিগের সাথে সম্পৃক্ত লাখো মানুষের মাঝে যে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে তার সমাধানের জন্য দেশ – বিদেশের সব অঞ্চলের যিম্মাদার ও সাথীদের পক্ষ থেকে নিযামুদ্দিন মারকাযে ধারাবাহিক যোগাযোগ করা হচ্ছে। আমাদের কাছে তাদের বিশেষ দাবী এইযে, মুসলমানদের বর্তমান সংকটাপন্ন বিশৃঙ্খলার এই যুগে উক্ত বয়ানের ব্যাপারে নিজেদের মতামত প্রকাশ করা। যাতে সকল সাথীদের মন শান্ত হয় এবং দাওয়াতের কাজে কোন ক্ষতি না হয়।

হযরত মাওলানা সাদ সাহেব দাঃবাঃ তো প্রথমে এই কাজের পুরাতন উসুল মুতাবেক এ কথা বলেছেন, সব সাথীর (এসব বিষয়ে মাথা না ঘামিয়ে) কাজে মশগুল থাকা উচিত। কিন্তু নিযামুদ্দিনের সাথীদের বারংবার তাকিদ ও উদ্ভূত পরিস্থিতির তাকাযাকে সামনে রেখে শুধু এতটুকু অনুমতি দিয়েছেন, ‘দারুল উলুমের আকাবির উলামায়ে কেরাম তাদের বয়ান প্রকাশের ৫ দিন পূর্বে আমার কাছে যে লিখিত ব্যাখ্যা তলব করেছিলেন তা আমি সেই দিনই তাদের খেদমতে পাঠিয়ে দেই- যা ৫ দিন পর্যন্ত তাদের কাছে বিবেচনাধীন ছিল-  শুধুমাত্র সেই রুজুনামা প্রকাশ করা যেতে পারে। আশা করি এটা সব সাথীর জন্য যথেষ্ট হবে ইনশাআল্লাহ। এছাড়া অন্যান্য প্রশ্নোত্তর, পত্রিকায় বক্তব্য প্রদান বা জবাবের নামে কোন প্রোপাগান্ডার অনুমতি নেই।’

দ্বীনের দাওয়াতের মুবারক খেদমত করনেওয়ালা সকল সাথীর প্রতি অনুরোধ, একাগ্রচিত্তে দাওয়াতের আমল ও ইবাদতে মশগুল থাকুন।

সালামান্তে
মাওলানা আব্দুস সাত্তার
মাওলানা জামশেদ আহমদ
মাওলানা শাহজাদ

 

৭ রবিউল আওয়াল ১৪৩৮ হি৭ ডিসেম্বর ২০১৬

আকাবিরে দেওবন্দ বরাবর মাওলানা সাদ এর পত্র

বিসমিহি তায়ালা
মুহতারাম হযরত মাওলানা মুফতি আবুল কাসিম সাহেব দাঃবাঃ ও অন্যান্য আকাবির উলামায়ে কেরাম সমীপে…

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ

আপনাদের লিখিত পত্র হস্তগত হয়েছে, যাতে অধমের বিভিন্ন বয়ানে উল্লেখিত কিছু আফকার ও দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়ে আপনাদের দারুল ইফতায় অভিযোগ এসেছে বলে উল্লেখ করা হয়। যেমনঃ কুরআন- হাদিসের ভুল বা মারজুহ ব্যাখ্যা, মনগড়া তাফসির, আম্বিয়ায়ে কেরামের শানে বেয়াদবি, সর্বসম্মত ফতোয়ার বিপরীতে ব্যক্তিগত রায় বা জুমহুরে উম্মতের মতের বিপরীতে বিশেষ মত গ্রহণ ইত্যাদি (নাউযুবিল্লাহ)।

১- এবিষয়ে প্রথমতঃ আমি অধম কোন প্রকার চিন্তা- ভাবনা ছাড়াই স্পষ্ট ভাষায় নিজের অবস্থান পরিষ্কার করা জরুরি মনে করি যে, আমি আলহামদুলিল্লাহ আমাদের সমস্ত আকাবির উলামায়ে দেওবন্দ ও সাহারানপুর এবং তাবলিগ জামায়াতের আকাবির মাওলানা মুহাম্মাদ ইউসুফ ও মাওলানা মুহাম্মাদ ইনআমুল হাসান রহঃ এর মাসলাক ও আদর্শের উপর কায়েম আছি এবং এর থেকে সামান্য পরিমাণ বিচ্যুতিও পছন্দ করি না।

 লিখিত পত্রে যেসব পুরাতন বয়ানের হাওয়ালা উল্লেখ করা হয়েছে আমি অধম দ্বীনী দায়িত্ব মনে করে সেগুলো থেকে পরিষ্কার শব্দেরুজ’’ করছি এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাচ্ছি।

আমাদের মাশায়েখ– বুজুর্গদের রীতি এই ছিলো যে, যখন কোন বিষয়ে নিজেদের ভুলের কথা জানতে পারতেন তখনই তার থেকে রুজু করতেন। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে বুজুর্গদের নকশে কদমের উপর চলার তাওফিক দিন এবং ভুলভ্রান্তি থেকে হেফাযত করেন।

২- দ্বিতীয়তঃ এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা জরুরি মনে করছি, সাম্প্রতিককালে একটি বিষয় দেখা যাচ্ছে, যারা দাওয়াতের কাজের সাথে জড়িত নন বা– আল্লাহ না করুন- বিরোধী মনোভাব পোষণ করেন, তাদের সর্বতভাবে চেষ্টা হলো, কিভাবে মাদারিসের উলামায়ে কেরাম ও দাওয়াতের সাথীদের মাঝে দূরত্ব, ঘৃণা ও কুধারণা সৃষ্টির মাধ্যমে পরস্পরের ভুলত্রুটিকে পুঁজি করে উম্মতের মাঝে বিশৃঙ্খলা বাড়ানো যায়। তাই এই ফেতনা থেকে উত্তরণের জন্য বিগত কয়েক বছর যাবত আমি অধম বয়ানের মধ্যে আকাবির উলামায়ে কেরামের মাসলাক– আদর্শ, দ্বীনী ইলম ও মাদারিসের গুরুত্ব এবং সমস্ত বিষয়ে উলামাদের শরণাপন্ন হওয়ার প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করছি। যাতে কুধারণার কোন সুযোগ না থাকে। এধরণের বয়ান প্রতিদিন মারকাযের শতশত জামাত রওয়ানা হওয়ার সময় করা হয়ে থাকে। যার যখন ইচ্ছা শুনে নিতে পারেন। দেশ – বিদেশের বড় বড় ইজতেমা – যার উপস্থিতি সংখ্যা লক্ষাধিক হয়– সেখানেও এই বিষয়ের ইহতেমাম করে থাকি।

গত বছর রাইবেন্ডের ইজতেমায় লাখো মানুষের সামনে অনেক বিস্তারিতভাবে ইলম ও উলামাদের কথা আলোচনা করেছি। মাওলানা সালিমুল্লাহ খান সাহেব দাঃবাঃ এর তত্বাবধানে জামিয়া ফারুকিয়া থেকে প্রকাশিত মাসিক ‘আল ফারুক’– যা চার ভাষায় প্রকাশিত হয়ে থাকে – পত্রিকার যিলকদ ১৪৩৬ হি মুতাবিক আগস্ট ২০১৫ সংখ্যায় উক্ত বয়ান গুরুত্ব সহকারে ছাপা হয়। যদিও অধমের বয়ান ব্যক্তিগতভাবে প্রকাশযোগ্য কিছু না, তবুও আওয়াম মানুষের মাঝ থেকে বদ গুমানি ও ভুল ধারণা দূর করার জন্য তারা এই বয়ান ছাপিয়ে নিজেদের ও মাদরাসার শরয়ী দায়িত্ব পালন করেছেন।বিশেষভাবে বয়ানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ লাল কালিতে মার্ক করে ছাপিয়েছেন। যেমনঃ ইলম উলামা এই দুনিয়াতে আল্লাহর বিশেষ নেয়ামত।উলামাদের যিয়ারত করা ইবাদত। উলামাদের মজলিসে উপস্থিত হয়ে তাদের থেকে ইস্তেফাদা করা এবং জীবনের সর্বক্ষেত্রে তাদের পরামর্শ নিয়ে চলা। আমাদের এই মেহনত জাহালাত দূর করে ইলমের তলব পয়দা করার মেহনত। দ্বীনের কোন শাখাকে অস্বীকার করা হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনীত আহকামাতের অস্বীকার করা ইত্যাদি।

দুই বছর পূর্বে সাহারানপুরের ইজতেমায় ও এই মাসে ভূপালের ইজতেমায় এই স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর দিকে পুরা খেয়াল রেখেছি।

গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত ভূপালের লাখো মানুষের ইজতেমায় করা অধমের বয়ান সকল প্রচারমাধ্যম, ফেসবুক, হোয়াটস আপ, ইউটিউবে বিশেষভাবে প্রচার করা হয়েছে। উক্ত বয়ানে নিম্নোক্ত কথাগুলো বলা হয়েছে,

উলামাদের মাজালিস মসজিদে তাফসিরুল কুরআনের দরস উম্মতের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বিষয়। যদি একে হালকা মনে করা হয় তবে বড় ধরণের ফেতনা মাহরুমির কারণ হবে

মনে রাখবেন, আমরা কোন জামাত নই। আমাদের কোন আলাদা মাযহাব বা ত্বরিকা নেই। আমরা সবাই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের অন্তর্ভুক্ত। দ্বীনী, দুনিয়াবি ইলমী সকল বিষয়ে আমাদের রাহনুমা পথিকৃৎ হলো এই দ্বীনী মাদরাসাসমূহ। যাদের আল্লাহ তায়ালা পুরা দেশের উপর, বিশেষভাবে ইউপি (উত্তর প্রদেশ) অঞ্চলে কেন্দ্রীয় রূপ দান করেছেন। উলামায়ে দেওবন্দের মাসলাকই আমাদের মাসলাক পথ। তাবলীগের সাথীদের নিজস্ব কোন পথ বা ত্বরিকা থাকা অনেক বড় গোমরাহি ফেতনার কারণ। এই কথা মন থেকে সম্পূর্ণ বের করে দিন। দ্বীনী মাদারিস ব্যতীত আমাদের অন্য কোন মারকায থাকবে, এই বিষয়ের কোন সুযোগ নেই

ভূপালের এই ইজতেমা শেষ হওয়ার পূর্বেই আমেরিকা, কানাডা, ব্রিটেন ও ইউরোপ থেকে উলামায়ে কেরাম উক্ত বয়ানের ভাল প্রভাব পড়ার কথা যিম্মাদার সাথীদের জানিয়েছেন। তারা সেই সংবাদ আমাকে অবহিত করেছেন। আজকাল এমন সব আধুনিক প্রচারমাধ্যম বেড়িয়েছে যে, স্টেজে বয়ান চলাকালীন অবস্থায়ই সারা দুনিয়ায় তা প্রচার হয়ে যাচ্ছে।

পুরা দুনিয়ায় উক্ত বয়ানসমূহের এমন প্রচার – প্রসার স্বত্ত্বেও অধমের পুরাতন বয়ানের কোথাও ঘটে যাওয়া যবানের অসতর্কতা বা বয়ানের সময় হিকমত – মসলাহাতের সব দিক খেয়াল না থাকায় কথার মধ্যে যে অস্পষ্টতা সৃষ্টি হয়েছে, তাকে কেন্দ্র করে আপনাদের মত আন্তর্জাতিক দ্বীনী মারকাযের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীল ব্যক্তিগণের মনে আমার ও আমাদের সাথীদের আদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারে যে ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে সেজন্য আমি অত্যন্ত ব্যথিত হয়েছি এবং একে দাওয়াত ও তাবলীগের মুবারক মেহনত ও তার মারকাযের সাথে অসহযোগিতামূলক আচরণ মনে করছি। বিষয়টি আল্লাহর কাছে সোপর্দ করলাম। তিনিই উত্তম ফায়সালাকারী।

বিঃদ্রঃ আমাদের মারকাযে লেটার প্যাড ও সীলমোহর ব্যবহারের প্রচলন নেই। এছাড়া অধমের বয়ানের যে বিষয়গুলো নিয়ে আপত্তি করা হয়েছে সে ব্যাপারে – নিজের অজ্ঞতা স্বত্ত্বেও – যতটুকু তথ্য ও সূত্র জানা আছে পরবর্তীতে পাঠানোর চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।

বান্দা মুহাম্মাদ সাদ (গুফিরালাহু)
বাংলাওয়ালি মসজিদ, নিযামুদ্দিন, দিল্লি

২ সফর ১৪৩৮ হি
৩০ নভেম্বর ২০১৬
রোজ বুধবার

মাওলানা সাদের চিঠির মূল কপি যা প্রকাশ করা হয়েছে দেওবন্দের ওয়েবসাইটে, পড়তে ক্লিক করুন

এই সম্পর্কে আগের প্রতিবেদনগুলো পড়তে নিচের লিংকগুলোতে ক্লিক করুন 

বিশ্ব তাবলিগের আমির মাওলানা সা’দ সম্পর্কে দেওবন্দের বিশেষ ফতোয়া

মাওলানা সা’দ সম্পর্কে দেওবন্দের ফতোয়ার সমর্থন দিল সাহরানপুর জামিয়া

বিশ্বতাবলিগের আমির সম্পর্কে দেওবন্দের ফতোয়া: কিছু বিভ্রান্তি ও তার জবাব