বুধবার, ২২ নভেম্বর ২০১৭

ads

ভারতের দুই মাদানি; বিভক্তি কতটুকু আমরা কী জানি?

OURISLAM24.COM
নভেম্বর ২১, ২০১৬
news-image

হাওলাদার জহিরুল ইসলাম
দেওবন্দ থেকে

madani

ভারতীয় মুসলমানদের সবচে’ পুরনো রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠন, ‘জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ৷’ যা ১৯১৯ সালে হজরত শায়খুল হিন্দ মাহমূদ হাসান দেওবন্দী রহ.-এর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়৷

শায়খুল আরব ওয়াল আজম হজরত সাইয়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানি রহ. ছিলেন তার একান্ত সহযোগী৷ সংগঠনটি ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা আন্দোলনে ঐতিহাসিক অবদান রাখে৷ স্বাধীনতার পর থেকে ভারতীয় মুসলমানদের যে কোনো সংকটে (ধর্মীয় বা সামাজিক) জমিয়ত অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে৷

প্রতিষ্ঠার পর থেকে দীর্ঘ ৯৯ বছর পর্যন্ত নেতৃত্বের পরিবর্তন আসলেও দলটির মাঝে কোনো বিভক্তি বা ফাটল সৃষ্টি হয়নি৷ কিন্তু ২০০৮ সালে এসে শত বছরের ঐক্যের বন্ধনে চির ধরে৷ তখনকার জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের প্রেসিডেন্ট মাওলানা সাইয়্যিদ আরশাদ মাদানি ও সেক্রেটারি জেনারেল, মাওলানা মাহমুদ আসআদ মাদানি’র চিন্তায় পার্থক্য দেখা দেয়৷ দু’জনের দর্শন দু’দিকে মোড় নিতে থাকে৷ শেষ পর্যন্ত জমিয়ত দুটি গ্রুপে বিভক্ত হয়৷ দেশের উলামা-তলাবাও দু’গ্রুপে বিভক্ত হয়৷ আম জনতা অনেকটা নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে৷

঳ কে হবেন দেশ গবেষক? অংশ নিন আপনিও

উভয় জমিয়তই ইসলাম, দেশ ও মানবতার জন্য কাজ করে চলে পাল্লা দিয়ে৷ ২০১৫ সালের রমজানে ভারতীয় মুসলমানগণ একটি খুশির সংবাদ শুনতে পান৷ ‘উভয় জমিয়ত নিজেদের চিন্তার পার্থক্য ভুলে গিয়ে দেশ ও জাতির জন্য এক সঙ্গে কাজ করার সিদ্ধান্তে উপনিত হয়েছে৷’ ঈদের পর দিল্লির হেড অফিসে জমিয়তের (দু’দলেরই) নেতৃবৃন্দ গোল টেবিল বৈঠকে মিলিত হন৷ পরস্পরের মতপার্থক্যের জায়গা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেন৷ তবে কর্ম-কৌশল নির্ধারণে কিছুটা মতপার্থক্য রয়ে যায়৷ ফলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসে এভাবে-

১৷ দুই জমিয়তের নেতৃবৃন্দ নিজ নিজ পদে বহাল থাকবেন৷ ২৷ সাধারণ কার্যক্রম চলবে এককভাবে৷ ৩৷ নিজ দলের কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সবাই স্বাধীন থাকবে৷ ৪৷ দেশ-জাতির কল্যাণে সবাই এক সাথে কাজ করবে৷ ৫৷ জাতীয় কোনো ইস্যুতে এককভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে না৷ ৬৷ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মেলনগুলোতে সবাই অংশ গ্রহণ করবে৷ ৭৷ সর্ব ক্ষেত্রে একে অন্যের সহযোগিতা করবে৷

madani3মুদ্দা কথা হলো, বাহ্যত জমিয়ত দুই হলেও বাস্তবে এক৷ তাদের মাঝে কার্যত কোনোই বিরোধই অবশিষ্ট থাকবে না৷ এ তো ছিলো জমিয়তের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস৷ তবে আমরা যে বিষয়টি এখানে ফোকাস করতে চাই তা হলো, জমিয়ত নেতৃদ্বয়, মাওলানা সাইয়্যিদ আরশাদ মাদানি ও সেক্রেটারি জেনারেল, মাওলানা মাহমুদ আসআদ মাদানি’র পারস্পরিক সম্পর্কটা কেমন? তারা কি আসলেই বিভক্ত? ব্যক্তি পর্যায়ে একে অন্যকে কতোটা মুহাব্বত করেন৷ তো চলুন সে বিষয়ে একটু আলোচনা করা যাক৷

অনেকেই মনে করেন দুই মাদানি’র পরস্পরের সম্পর্কটা ভালো নয়৷ পরস্পরের মাঝে দূরত্ব অনেক৷ মজার ব্যাপার হলো, তাদের বিরোধে (!) র বিষয়টি বাংলাদেশের জমিয়ত পর্যন্ত গড়িয়েছে৷ সেখানেও কিছুটা সংকটের সৃষ্টি হয়েছে৷ অথচ বাস্তব চিত্রটা কিন্তু একেবারেই ভিন্ন৷ তাদের পারিবারিক বন্ধন কতেটা মজবুত একে অন্যের কতোটা কাছের কয়েকটি উদাহরণ দিলেই তা স্পষ্ট হয়ে যাবে৷

১৷ আরশাদ মাদানিকে বর্তমান ‘মাদানি খানদানে’র অভিভাবক নির্ধারণ৷ কিছু দিন আগে মাওলানা মাহমুদ মাদানি দিল্লির জমিয়ত অফিসে এক আলেমের প্রশ্নের জবাবে বলছিলেন, ‘মাদানি পরিবারে বহু আগ থেকেই একটি নিয়ম আছে, পুরো খান্দানের একজন মুরুব্বি বা অভিভাবক থাকেন৷ বর্তমানে আমরা সবাই মিলে আমার শ্রদ্ধেয় চাচা মাওলানা সাইয়্যিদ আরশাদ মাদানিকে আমাদের পারিবারিক অভিভাবক নির্ধারণ করেছি৷ কর্মক্ষেত্রে কৌশলগত ও কাঠামোগত দিক থেকে পরস্পরের কিছুটা দ্বিমত থাকতে পারে৷ এটা স্বাভাবিক৷ এটাকে ব্যক্তিপর্যায়ে টেনে আনা উচিত নয়৷’

২৷ মাহমুদ মাদানির ছেলের বিয়ে পড়িয়েছেন আরশাদ মাদানি৷ গত দু’বছর আগে মাওলানা মাহমুদ মাদানি’র ছেলে ‘হুসাইন মাদানি’র বিয়ে হয়৷ ওই বিয়ের মুরব্বি ছিলেন মাওলানা সাইয়্যিদ আরশাদ মাদানি৷ এমনকি স্বয়ং আরশাদ মাদানি ওই বিয়ের খুৎবা পাঠ করেন৷

madani2৩৷ গত বছর ১২,মার্চ দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী ইন্ডোর ইস্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত জমিয়তের ‘জাতীয় ঐক্য সম্মেলনে’ সবাইকে অবাক করে দিয়ে মাওলানা সাইয়্যিদ আরশাদ মাদানি মাওলানা মাহমুদ মাদানি’র হাত ধরে নিয়ে মঞ্চে আরোহরণ করেন৷ তখন ওই সম্মেলনস্থলের লক্ষ লক্ষ জনতা তাদের পারস্পরিক ভালোবাসা দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন৷ সবাই নিজেদের শুধরে নেবার চেষ্টা করেন৷ জাতীয় দুু’ নেতার এমন হৃদ্যতা থেকে ঐক্যের শিক্ষা গ্রহণ করেন৷ এতো দিন তাদের পারিবারিক মুহাব্বত-ভক্তি জনতা দেখতে না পেলেও ওই দিন দেখার সুযোগ পায়৷

৪৷ মাহমুদ মাদানির বাসভবনের খাদেমের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম, যখনই মাহমুদ মাদানি দেওবন্দে আসেন চাচার (আরশাদ মাদানি) সাথে দেখা করতে যান৷ তার বাসায় একসঙ্গে খানায় শরিক হন৷ তার স্বাস্থ্যের খোঁজ-খবর নেন৷ এছাড়া বছরে দু’একবার পারিবারিক ভোজের আয়োজন করা হয়৷ তখনও সবাই আনন্দের সাথে এক দস্তরখানে মিলিত হন৷ দেওবন্দে ৪/৫ বছর ধরে আছেন এবং মাদানি পরিবারের সাথে সম্পর্ক রাখেন এমন ক’জন ছাত্রও ওপরের বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করলেন৷

তারা আরো জানালেন, ঈদের সময় উভয় হজরত একসঙ্গে নামাজ আদায় করে বাসায় ফেরেন৷ পরস্পরের বাসায় মিষ্টান্ন হাদিয়া পাঠান৷ দুপুরে একই দস্তরখানে খাবার গ্রহণ করেন৷ এমন উদারহণ ভুরি ভুরি দেয়া যাবে৷ অথচ বাংলাদেশি রাজনীতিকদের মধ্যে এ ধরনের চিন্তা কল্পনাও আনা অসম্ভব।

বড়রা আসলেই `বড়’ হন৷ এই তো হো তাদের আদর্শিক পরিচয়৷ কর্মক্ষেত্রে কৌশলগত দ্বিমত থাকলেও ব্যক্তিপর্যায়ে নেই সামান্যতম দূরত্ব৷ এটাই তো নববি আদর্শ৷ এটাই খোলাফায়ে রাশেদিনের চরিত্র৷ তারা তো সে আদর্শ ও চরিত্রের বাহক৷ তাদের শরীরে যে প্রবাহিত হয় নবি বংশের রক্তধারা! এখান থেকেই আমরা শিখতে পারি৷ ভুলে যেতে পারি নিজেদের ছোট-খাটো দ্বন্দ্ব৷ নিতে পারি ঐক্যের শপথ৷

আরআর

মহাসচিব, মহাপরিচালক এবং আগামী দিনের বেফাক

নাসিক নির্বাচনে মুফতী মাসুম বিল্লাহ